একজন মাত্র ১৮ বছর বয়সেই বিশ্বফুটবলের নতুন বিস্ময়। অন্যজন মাঠের প্রতিটি ঘাসে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়া এক যোদ্ধা। একদিকে লামিনে ইয়ামালের ক্ষিপ্রতা, ড্রিবলিং আর গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা, অন্যদিকে ফেদেরিকো ভালভার্দের নেতৃত্ব, দূরপাল্লার শট এবং মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা। ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ এইচের শেষ ম্যাচে এই দুই তারকার দ্বৈরথই হতে পারে স্পেন-উরুগুয়ে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
শুক্রবার নকআউট পর্বের টিকেট নিশ্চিত করার মিশনে মুখোমুখি হবে ইউরোপের শক্তিধর স্পেন ও দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী দল উরুগুয়ে। দুই ম্যাচ শেষে চার পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে রয়েছে স্পেন। অন্যদিকে টানা দুই ড্রয়ে দুই পয়েন্ট সংগ্রহ করে দ্বিতীয় স্থানে আছে উরুগুয়ে।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে কেপভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছিল স্পেন। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে নিজেদের শক্তির জানান দেয় লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। সেই ম্যাচে জোড়া গোল করেন মিকেল ওয়ারিয়াসাবাল, আর গোলের খাতা খোলেন তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালও। ফলে এই ম্যাচে জিতলেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ ৩২ নিশ্চিত করবে লা রোজারা।
অন্যদিকে উরুগুয়ের শুরুটা আশানুরূপ হয়নি। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে ১-১ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে কেপভার্দের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে তারা নিজেদের কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। ফলে স্পেনের বিপক্ষে জয়ই এখন তাদের সবচেয়ে নিরাপদ সমীকরণ। সর্বশেষ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে স্পেন রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে আর উরুগুয়ের অবস্থান ১৬।
র্যাঙ্কিংয়ের মতো দলগত শক্তিতেও কিছুটা এগিয়ে ইউরোপিয়ানরা। বল দখলভিত্তিক ফুটবল, দ্রুত পাসিং এবং আক্রমণে বৈচিত্র্যই স্পেনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ইয়ামাল, পেদ্রি, নিকো উইলিয়ামস ও দানি ওলমোর মতো তারকারা মুহূর্তেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
অন্যদিকে উরুগুয়ের শক্তি তাদের অদম্য লড়াকু মানসিকতা ও অভিজ্ঞতার মিশেল। ফেদেরিকো ভালভার্দে, দারউইন নুনিয়েস ও ম্যাক্সি আরাউহো প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। তবে ইনজুরির কারণে রোনাল্ড আরাউহো ও জিওর্জিয়ান দে আরাসকায়েতার অনুপস্থিতি দলটির জন্য বড় ধাক্কা। ইতিহাসও স্পেনের পক্ষেই কথা বলছে। দুই দলের ১০ দেখায় পাঁচটিতে জিতেছে স্পেন, বাকি পাঁচটি ড্র। উরুগুয়ে এখনও স্পেনের বিপক্ষে জয়ের মুখ দেখেনি। সর্বশেষ ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপে স্পেন ২-১ গোলে হারিয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার দলটিকে।
কাগজে-কলমে স্পেন কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে উরুগুয়েকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ইয়ামালের সৃজনশীলতা আর ভালভার্দের লড়াকু নেতৃত্বের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কার হাসিতে শেষ হবে, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।
এদিকে বিশ্বকাপের গ্রুপ এইচে সবচেয়ে নাটকীয় সমীকরণগুলোর একটি তৈরি হয়েছে কেপভার্দে ও সৌদি আরবের ম্যাচ ঘিরে। হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুদল। নকআউটের আশা এখনও বেঁচে থাকলেও সমীকরণে এগিয়ে কেপভার্দে। দুই ম্যাচে দুই পয়েন্ট নিয়ে তারা আছে তৃতীয় স্থানে আর এক পয়েন্ট নিয়ে তলানিতে সৌদি আরব। বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কেপভার্দে ইতিমধ্যেই চমক দেখিয়েছে।
প্রথম ম্যাচে ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেয় তারা। দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী উরুগুয়ের বিপক্ষে দুবার পিছিয়ে পড়েও ২-২ সমতা নিয়ে মাঠ ছাড়ে আফ্রিকার ছোট দ্বীপরাষ্ট্রটি। অন্যদিকে সৌদি আরব শুরুতে উরুগুয়ের সঙ্গে ১-১ ড্র করলেও দ্বিতীয় ম্যাচে স্পেনের কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও দুই দলের ব্যবধান খুব বেশি নয়। সর্বশেষ র্যাঙ্কিংয়ে সৌদি আরব রয়েছে ৬১তম স্থানে আর কেপভার্দে ৬৭তম অবস্থানে। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে এবারের বিশ্বকাপে র্যাঙ্কিংয়ের পার্থক্য খুব একটা বোঝা যায়নি।
কেপভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। ৩৯ বছর বয়সি এই অভিজ্ঞ গোলকিপার স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত সব সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছেন। দুই ম্যাচে তার সাতটি সেভ কেপভার্দের নকআউট স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষকের নেতৃত্বেই আফ্রিকান দলটি নিজেদের রক্ষণকে অন্যতম শক্তিশালী ইউনিটে পরিণত করেছে।
আক্রমণে অধিনায়ক রায়ান মেন্দেস ও স্ট্রাইকার ডাইলন লিভরামেন্তো ভরসার নাম। অন্যদিকে সৌদি আরবের প্রধান তারকা ও অধিনায়ক সালেম আল-দাওসারি। মাঝমাঠে মোহাম্মদ কান্নো এবং সামনে ফিরাস আল-বুরাইকানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে স্পেনের বিপক্ষে রক্ষণভাগের দুর্বলতা তাদের বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমীকরণ সহজ- সৌদি আরবকে নকআউটের আশা বাঁচিয়ে রাখতে জিততেই হবে। কেপভার্দের জন্য জয় নিশ্চিতভাবে ইতিহাস গড়ার সুযোগ এনে দেবে আর ড্র হলেও স্পেন যদি উরুগুয়েকে হারায় তবে তারাও শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিতে পারে। তাই এটি শুধু একটি গ্রুপ ম্যাচ নয় বরং দুই দলের জন্যই ইতিহাস লেখার লড়াই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও