পুকুর যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস

হুমায়ুন কবীর, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ)

সারাদেশ

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনের দেয়াল ঘেঁষে সরকারি পুকুরটি যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস! গত কয়েক বছরে এই

2026-06-25T05:34:23+00:00
2026-06-25T05:34:23+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
সারাদেশ
পুকুর যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস
হুমায়ুন কবীর, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ৫:৩৪ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনের দেয়াল ঘেঁষে সরকারি পুকুরটি যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস! গত কয়েক বছরে এই পুকুর ঘিরে বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে খরচ করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবন সংলগ্ন সরকারি পুকুরটি যেন একটি সোনার খনিতে পরিণত হয়েছে। 

নতুন কোনো ইউএনও দায়িত্ব গ্রহণ করলেই পুকুর উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং এসব প্রকল্পের বিপরীতে লাখ লাখ টাকার বরাদ্দ নেওয়া হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে পুকুরটির গাইড ওয়াল নির্মাণ, সংলগ্ন রাস্তার সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন, আলোকসজ্জা, বসার স্থান ও টাইলস স্থাপন, এমনকি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষ প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে পৌরসভা ও সরকারি কোষাগার থেকে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে বিপুল অঙ্কের এই ব্যয়ের সুফল ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে।

পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউএনও বাসভবনের দেয়াল ঘেঁষে সরকারি পুকুর এবং অন্য পাশে ইউএনওর বাসভবনের সীমানা প্রাচীর। মাঝখানে অর্ধশত বছরের পুরোনো আহাম্মদ সরকার নামে একটি সড়ক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণ এই সড়ক ব্যবহার করে আসছেন। সড়কটি বছর দুয়েক আগেই প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে পুনঃসংস্কার করা হয়েছিল। সম্প্রতি আবারও নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সড়কটির বিদ্যমান গতিপথ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ কাজের জন্য পৌরসভা থেকে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে এবং স্থানীয়দের বাধার মুখে কাজটি আপাতত বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও স্থানীয় বাসিন্দা ফয়েজ উদ্দিন সরকার ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, এই রাস্তা বন্ধ কইরা দিয়া কেল্লাইগ্যা আরেকটা রাস্তা করুইন লাগে? কেল্লাইগ্যা সরকারি টেহা অপচয় করুইন লাগে? রাস্তার লগের দীঘি (পুকুর) খনন কইরা অর্থ আত্মসাৎ করছে। পৌরসভার কত রাস্তা আছে মানুষ হাঁটবার পারে না; ওইগুলা ঠিক করতে পারে না?

ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, পুকুরটি আমার সরকারি বাসভবনের পাশে হওয়ায় বিষয়টি আমার নজরে আসে। জানা যায়, ২০২৪ সালে সাবেক ইউএনও সারা দেশে মডেল হিসেবে এআই পদ্ধতিতে এ পুকুরে মাছ চাষ প্রকল্প শুরু করেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর একদিন আমি লক্ষ্য করি, পুকুরে মাছ, পানি কিংবা প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কোনো যন্ত্রপাতি নেই। এগুলো কে বা কারা সরিয়ে নিয়েছে, সে বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। আমি আসার পর এ পুকুরের জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে কোনো বরাদ্দ গ্রহণ করিনি।

পৌরসভার প্রকৌশলী দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোভিড-১৯ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পুকুরটিতে ৬ লাখ ৪০ হাজার ৬২৩ টাকা ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরেএডিপি থেকে পুকুর পাড়ে নতুন লাইট স্থাপনের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৮২৭ টাকা। এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপির পুকুরের একপাশ ভরাট করে সড়কের গতিপথ পরিবর্তনের জন্য ১২ লাখ ৩৬ হাজার ৫২ টাকার একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পুকুরে এর আগেও বিভিন্ন অর্থবছরে বরাদ্দের কাজ দেখানো হয়েছে। পৌরসভার বাইরে সরকারি কোষাগার থেকে এ পুকুরের উন্নয়নের নামে বিভিন্ন সময়ে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো প্রকল্পই স্থায়ীভাবে আলোর মুখ দেখেনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে পুকুরটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় পুকুরটি গভীর খনন করা হয় এবং বিভিন্ন আধুনিক ও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়। পরে বিভাগীয় কমিশনারকে দিয়ে প্রকল্পটির উদ্বোধনও করানো হয়। এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে দাবি করা হয়, এআই পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব হবে। তবে প্রকল্পটি বেশি দিন টেকেনি। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প চালুর ছয় মাসের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ইউএনও বদলি হয়ে গেলে মাছ চাষ কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। পরে জানা যায়, পুকুর খনন কাজের ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করা হয়নি। এ ছাড়া বিশ্বাস ফিশ ফিড থেকে আনা মাছের খাদ্যের মূল্যও বকেয়া থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে পাওনা আদায়ের অংশ হিসেবে পুকুরের মাছ তুলে বিক্রি করে দেয় বিশ্বাস ফিশ ফিড কর্তৃপক্ষ। এদিকে প্রকল্পে ব্যবহৃত এআই প্রযুক্তির যন্ত্রপাতিগুলো বর্তমানে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সেগুলোর অবস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

পুকুর খননের ঠিকাদার খাইরুল ইসলাম বলেন, পুকুর খনন বাবদ আমার ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার বিল হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত একটি টাকাও পরিশোধ করা হয়নি। বর্তমান ইউএনও স্যারের কাছে বিলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের ইউএনও কাজ করিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। অথচ এই প্রকল্পের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন হয়েছে। আমার প্রশ্ন, পুকুর খননের বিলের টাকা গেল কোথায়?

তিনি আরও বলেন, খননকৃত মাটি থানা চত্বরের পুকুর ও মসজিদের জায়গা ভরাটে ব্যবহার করা হয়েছে। সাবেক ইউএনও স্যার এই কাজের কোনো টেন্ডার দেননি। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ইউএনওর কাজ হওয়ায় টেন্ডারের প্রয়োজন নেই। বিলের বিষয়ে জানতে একাধিকবার তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বিল পরিশোধ না হওয়ায় তিনি বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এআই প্রযুক্তি-সংক্রান্ত কাজের ঠিকাদার হেদায়েত উল্লাহ ফুরাত বলেন, সাবেক ইউএনও আমাকে ডেকে এআই প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষ প্রকল্পের শেডঘর নির্মাণ, স্যানিটারি, বৈদ্যুতিক কাজ এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহের দায়িত্ব দেন। এসব কাজ কোনো টেন্ডার ছাড়াই আমাকে দেওয়া হয়েছিল। আমি প্রায় ১৩ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন করি। ইউএনও বদলি হয়ে চলে যাওয়ার পর অনেক ঘোরাঘুরির পর পরবর্তী ইউএনও বাকীউল বারী স্যার আমাকে ৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকার একটি বিল পরিশোধ করেন। তবে এখনও প্রায় ৫ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এ বিষয়ে বর্তমান ইউএনও আরফাত সিদ্দিকী স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আগের ইউএনও চলে গেছেন, এখন আমি কী করব?

বিশ্বাস ফিশ ফিডের ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন বলেন, এটি একটি গবেষণামূলক প্রকল্প ছিল। তাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মাছ ও মাছের খাবার সরবরাহ করা হয়েছিল। কথা ছিল, মাছ বিক্রির অর্থ তারা গ্রহণ করবে। পুকুরটি উপজেলা প্রশাসনের হলেও পুকুর ব্যবহারের বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলাদা কোনো চুক্তি ছিল না। তিনি দাবি করেন, প্রকল্পটিতে তার প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে মাছ বিক্রি করে তিনি মাত্র আড়াই লাখ টাকা পেয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা জাবাদুল হক খান বলেন, এই পুকুর যেন সোনার খনি। এখানে মাছ চাষ প্রকল্প দেখিয়ে এক কোটি টাকার ওপরে খরচ করা হলেও কোনো ফায়দা হয়নি।

সময়রে আলো/আআ



  বিষয়:   পুকুর  সোনার ডিম  হাঁস 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: