৩ জনের অদম্য সাহসে টিকে রইল ৫০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ

রাজশাহী সংবাদদাতা

সারাদেশ

গাছটির বয়স কত? ৫০০ বছর নাকি তারও বেশি? সুনির্দিষ্ট হিসাবটা কারও জানা নেই। তবে যুগের পর যুগ ধরে ডালপালা থেকে

2026-06-27T21:19:35+00:00
2026-06-27T21:19:35+00:00
 
  শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
সারাদেশ
৩ জনের অদম্য সাহসে টিকে রইল ৫০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ
রাজশাহী সংবাদদাতা
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ৯:১৯ পিএম 
কুঠারের হাত থেকে পরম বন্ধুকে বাঁচাল। সংগৃহীত ছবি
গাছটির বয়স কত? ৫০০ বছর নাকি তারও বেশি? সুনির্দিষ্ট হিসাবটা কারও জানা নেই। তবে যুগের পর যুগ ধরে ডালপালা থেকে নেমে আসা স্তম্ভমূলগুলো আজ মাটির বুকে এমনভাবে মিশে গেছে যে, গাছটির আসল কাণ্ড বা মূল কোনটি, তা চেনার আর উপায় নেই। প্রায় এক বিঘা জমিজুড়ে ডালপালার এক বিশাল সবুজ সাম্রাজ্য মেলে দাঁড়িয়ে আছে এই সুপ্রাচীন বটবৃক্ষ। রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর এলাকার ময়েনপুর মহল্লার ঈদগাহ মাঠে ঠাঁই নেওয়া এই গাছটি আজ শুধু একটি উদ্ভিদ নয়, পুরো এলাকার অহংকার। অথচ আজ থেকে প্রায় ২১ বছর আগে এই পরম বন্ধুকেই পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছিল!   

২০০৫ সালের সেই দিনগুলোতে ময়েনপুরের ঈদগাহ মাঠের এই বটগাছটি ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। স্থানীয় কিছু মানুষ চাইলেন গাছটি কেটে ঈদগাহের জায়গা বড় করতে। তবে সেই চাওয়ার আড়ালে লুকিয়ে ছিল অন্য এক গল্প। কিছু মানুষ ফন্দি এঁটেছিলেন—গাছটি কেনাবেচায় কারচুপি করে নিজেদের পকেট ভারী করবেন। গাছ কাটার কুঠার যখন প্রায় প্রস্তুত, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির হলেন গ্রামের এক অদম্য ও দূরদর্শী মুরব্বি মফিজ উদ্দিন। বুক চিতিয়ে তিনি এক অমোঘ বাণী উচ্চারণ করলেন, ‘এই গাছের মধ্যে আমারও ভাগ আছে। আমি আমার ভাগ বিক্রি করব না।’   


তার এই একটি কথাই ছিল এক মহাসত্য। ঈদগাহের মাঠ যেহেতু পুরো সমাজের, তবে এই গাছটির মালিকানাও তো গ্রামের প্রতিটি মানুষের! মফিজ উদ্দিনের সেই ভাগ না কিনে গাছ কাটার সাধ্য কার? তার এই দৃঢ়তা যেন পুরো গ্রামে প্রতিবাদের এক নতুন আগুন জ্বেলে দিল। সেই সবুজ বাঁচানোর লড়াইয়ে মফিজ উদ্দিনের পাশে এসে হাত মেলালেন স্থানীয় গৌরাঙ্গপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক আবদুল লতিফ এবং গ্রামের সাধারণ কৃষক আলী আফজাল খাঁ। স্কুলশিক্ষক আবদুল লতিফ ঘরে বসে না থেকে তড়িৎ গতিতে খবর দিলেন বন বিভাগকে।   

খবর পেয়ে ময়েনপুর গ্রামে ছুটে এলেন বন বিভাগের তৎকালীন কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী, যিনি বর্তমানে রাজশাহী বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার হিসেবে কর্মরত। তৎকালীন তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু তাজ মো. জাকির হোসেনের নির্দেশে তিনি এসেছিলেন গাছটির সরকারি সরকারি মূল্য নির্ধারণ করতে।   


ইউসুফ আলী গ্রামে পা রাখতেই এক রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন। গাছ কাটার পক্ষের কিছু লোক গোপনে তার পিছু নিলেন। তাদের পকেটে ছিল ৫০০ টাকার নোট। মতলব ছিল বন কর্মকর্তাকে সেই ৫০০ টাকা ঘুষ দিয়ে কাগজে-কলমে গাছটির দাম অনেক কমিয়ে ধরা। যাতে পরবর্তীতে নামমাত্র মূল্যে গাছটি কিনে তারা ভেতর থেকে অন্তত ৫ হাজার টাকা মুনাফা লুটতে পারেন। কিন্তু চতুর ও সৎ কর্মকর্তা ইউসুফ আলী তাদের সেই ফাঁদ ধরে ফেললেন। তিনি বুঝতে পারলেন, একদল মানুষ যখন লোভের তাড়নায় গাছটি ধ্বংস করতে চায়, অন্য দল তখন নিঃস্বার্থভাবে প্রকৃতিকে বাঁচাতে লড়ছে।   

ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে ঘটনাক্রমে সেখানে উপস্থিত হলেন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান। তিনিও গাছটি কাটার তীব্র বিরোধিতা করলেন। সবার মতামতের ভিত্তিতে কর্মকর্তা ইউসুফ আলী নিজের সততায় অটল থেকে গাছটির সরকারি মূল্য ধরলেন ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকারও বেশি!   

এর কিছুদিন পরই ইউসুফ আলী তানোর থেকে বদলি হয়ে যান। কিন্তু লোভী চক্রটি দমে যায়নি। তারা আরও দু-দুবার নতুন করে মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা চালায়। কিন্তু প্রকৃতির আর্শীবাদেই হোক আর নিয়মের কড়াকড়িতেই হোক, পরবর্তীতে যে কর্মকর্তাই এসেছেন, কেউ প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানের সেই চড়া মূল্যের নিচে দাম নামাতে পারেননি। সরকারি খাতার সেই বিশাল দামের অঙ্ক দেখে একপর্যায়ে গাছ কাটার সেই সিন্ডিকেট পুরোপুরি হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, প্রকৃতিপ্রেমী দলটির অবস্থান আইনিভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর এভাবেই একদল মানুষের লোভের হাত থেকে বেঁচে যায় শতবর্ষী এই প্রাচীন বটগাছ।   

গাছটিকে রক্ষা করায় গত ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এই তিন বীর-বর্তমানে ৭৮ বছর বয়সী মফিজ উদ্দিন, ৭৫ বছর বয়সী আলী আফজাল খাঁ এবং ৭০ বছর বয়সী আবদুল লতিফকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে ‘বারসিক’ নামের একটি গবেষণা সংস্থা।   

আজ ময়েনপুরের এই বটবৃক্ষ কেবলই এক সবুজ পাতার চাদর নয়, এটি এক জীবন্ত ইতিহাস। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে একনজর এই গাছটিকে দেখতে। আজ ময়েনপুর বললেই দেশের মানুষ একনামে চেনে এই বটগাছকে। যে গাছটিকে একদিন কেটে ফেলার ছক কষা হয়েছিল, আজ সেই গাছটিই পরম মমতায় ছায়া দিয়ে আগলে রাখছে পুরো ময়েনপুরকে।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   প্রাচীন বটগাছ  রাজশাহী 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: