চট্টগ্রামের আয়তনে বৃহত্তম উপজেলা ফটিকছড়িকে বিভক্ত করে দুটি আলাদা উপজেলা করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যমান ফটিকছড়ি উপজেলার পাশাপাশি নতুন আরেকটি প্রশাসনিক ইউনিট হচ্ছে ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’। আগামী বুধবার (১ জুলাই) প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় এই প্রস্তাবনাটি পাসের জন্য উপস্থাপিত হবে বলে জানা গেছে।
এর আগে, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির (প্রি-নিকার) সভায় নতুন এই উপজেলা গঠনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ও খসড়া অনুমোদন করা হয়েছিল। মূলত দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অসুবিধা দূরীকরণ, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা ও জনসেবার মানোন্নয়নের স্বার্থে স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ফটিকছড়ি উপজেলায় ২টি থানা (ফটিকছড়ি ও ভূজপুর), ২টি পৌরসভা (ফটিকছড়ি ও নাজিরহাট) এবং ১৮টি ইউনিয়ন রয়েছে। প্রায় ৭ লাখ জনসংখ্যার এই বৃহৎ উপজেলাকে দেখভাল করা একক প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য বেশ দুরূহ। বর্তমানে দেশে মোট ৪৯৫টি উপজেলা রয়েছে, নতুন এই উপজেলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হলে দেশে মোট উপজেলার সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৯৬-এ।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বৃহৎ এই উপজেলাকে ভাগ করার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত ইতিবাচক। বিভাজনের ফলে সরকারি উন্নয়নমূলক বরাদ্দ ও বাজেট দ্বিগুণ হবে, যা মাঠপর্যায়ে জনসেবা প্রাপ্তি আরও দ্রুত ও কার্যকর করবে। অনুমোদন পাওয়ার পর প্রাথমিকভাবে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদায়নের মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু হবে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য সরকারি দফতরের কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হবে।
নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চললেও এর সীমানা নির্ধারণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু অসন্তোষ ও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। প্রস্তাবিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সঙ্গে বৃহত্তর সুয়াবিল ইউনিয়ন এবং নাজিরহাট পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত হবে কি-না, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। এর আগে ‘বৃহত্তর সুয়াবিল অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ এই এলাকাগুলোকে প্রস্তাবনা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছিল। তাদের দাবি, এগুলোকে উত্তর ফটিকছড়ির সঙ্গে যুক্ত করলে চরম আইনি ও ভৌগোলিক জটিলতা তৈরি হবে।
নতুন উপজেলার সদর দফতর বা প্রশাসনিক ভবন কোথায় হবে, তা নিয়ে উত্তরের বাসিন্দাদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। একটি পক্ষ চায় সুয়াবিল ও নাজিরহাট পৌরসভাকে যুক্ত করে ভূজপুর এলাকায় সদর দফতর করতে। অন্য পক্ষের দাবি, সদর দফতর আরও উত্তরে নারায়ণহাট ইউনিয়নের জুজখোলা মৌজায় করা হোক। তবে সচেতন মহলের অভিমত, সব ইউনিয়নের মানুষ যাতে সমানভাবে যাতায়াত সুবিধা পায়, এমন কেন্দ্রস্থলেই সদর দফতর হওয়া উচিত। এই সমস্যা সমাধানে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গণশুনানিও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ফটিকছড়ি উত্তরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে তারা যুগ যুগ ধরে মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। যেমন— ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নাজিরহাটে অবস্থিত, যা পার্শ্ববর্তী হাটহাজারী উপজেলার খুব কাছে হওয়ায় উত্তরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এর সুফল পান না। এছাড়া, নব্বইয়ের দশকের আগে এ অঞ্চলে কোনো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। বর্তমানে কিছু বেসরকারি স্কুল-কলেজ থাকলেও কোনো সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় বা কলেজ নেই। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই অঞ্চলে শিক্ষার হারও তুলনামূলক কম। ফলে নতুন উপজেলা হলে এই দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, নতুন উপজেলা অনুমোদনের বিষয়টি সাধারণত নিকার সভায় চূড়ান্ত হয়। ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা গঠনের ফাইলটি বর্তমানে নিকার সভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।
সময়ের আলো/জোই