অদম্য সেলেসাও, এই ক্ষ্যাপা ব্রাজিলকে রুখবে কে?

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

ফুটবল কখনো কখনো ঠিক সাগরের জোয়ার-ভাটার মতো। কোথাও তা শান্ত জলধির মতো মায়াবী, কোথাও তীব্র ঘূর্ণি, আর কোথাও হঠাৎ ধেয়ে

2026-06-30T03:50:53+00:00
2026-06-30T03:50:53+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
খেলা
অদম্য সেলেসাও, এই ক্ষ্যাপা ব্রাজিলকে রুখবে কে?
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ৩:৫০ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ফুটবল কখনো কখনো ঠিক সাগরের জোয়ার-ভাটার মতো। কোথাও তা শান্ত জলধির মতো মায়াবী, কোথাও তীব্র ঘূর্ণি, আর কোথাও হঠাৎ ধেয়ে আসা সর্বনাশা ভাঙন। যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনের সবুজ গালিচায় তেমনই এক রূপক নদীর স্রোতে গা ভাসাল পুরো বিশ্ব। রাতটা যখন শুরু হয়েছিল, তখন চারধারে কেবলই জাপানের নিখুঁত শৃঙ্খলার জ্যামিতিক আলো। আর যখন শেষ হলো, তখন সেখানে আছড়ে পড়েছে ব্রাজিলের এক পলিমাটি জড়ানো হলুদ ঝড়।

ম্যাচের প্রথমার্ধে জাপান যেন মাঠের বুকে বাঁশের বেড়া তুলে দাঁড়িয়েছিল। নম্র, বিনীত অথচ পাথরের মতো কঠিন সেই নীল দেয়াল। ব্রাজিল বল পায়ে রাখল, ফাঁকফোকর খুঁজলো, কিন্তু জাপানি শৃঙ্খলার দরজায় তখনো ঝুলছিল এক দুর্ভেদ্য তালা। আর ঠিক সেই বন্ধ দরজার ফাঁক গলে, ম্যাচের ২৯তম মিনিটে কাইশু সানো যা করলেন, তাকে বজ্রাঘাত ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়! তাঁর দূরপাল্লার শটটি যখন অ্যালিসনকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ালো, হিউস্টনের গ্যালারিতে তখন হলুদ শিবিরে নেমে এলো এক অদ্ভুত, স্তব্ধ নিস্তব্ধতা।

জাপান যেন বিশ্বকে জানিয়ে দিচ্ছিল-তারা এখানে শুধু অংশ নিতে আসেনি, অনেক দূর যাওয়ার মন্ত্র জেনেই এসেছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বল পেলেই দুই-তিনজন নীল জার্সিধারী ছায়ার মতো তাঁকে ঘিরে ধরছিল। রায়ান, মাতেউস কুনিয়া কিংবা লুকাস পাকেতারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছিলেন বটে, কিন্তু জাপানি প্রাচীরের সামনে ব্রাজিলের আক্রমণ তখন শুধুই আলো-ছায়ার এক নিষ্ফল খেলা। দেখতে সুন্দর, কিন্তু দিনশেষে বড্ড ধারহীন।

কিন্তু ইতিহাস ফিসফিস করে বলে, ব্রাজিলের এই নীরবতা কখনো পরাজয়ের আত্মসমর্পণ নয়। এ তো আসলে ঝড়ের আগের সমুদ্রের এক থমথমে রূপ। কার্লো আনচেলত্তির এই নতুন ব্রাজিল শুধু সাম্বার জাদুতে মাতাল হওয়া কোনো দল নয়; এটি এক হিসেবি দল, পরম ধৈর্যের দল, যে প্রতিপক্ষের একটিমাত্র ভুলের জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করতে জানে। এই দলের রক্তে যেমন পুরোনো ব্রাজিলের ধ্রুপদী কবিতা আছে, তেমনি মগজে আছে ইউরোপীয় বাস্তবতার কঠোর ব্যাকরণ।

দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামার আগে টানেলে দাঁড়িয়ে নেইমার যেন সতীর্থদের চোখে চোখ রেখে সেই অদৃশ্য বার্তাই দিয়ে গেলেন। আর বিরতির পর যখন দল মাঠে ফিরল, বদলে গেল পুরো ব্রাজিলের মানসিকতার ক্যানভাস।


ডন কার্লো এবার চাল চাললেন। মাঠে নামালেন তরুণ তুর্কি এন্ড্রিককে। আর তাতেই ওলটপালট হয়ে গেল দাবার ছক। এন্ড্রিক বারবার জাপানের বক্সে ঢুকে তৈরি করতে লাগলেন তীব্র অস্থিরতা। ব্রাজিল তখন আর শুধু বলের বৃত্ত তৈরি করছিল না, একের পর এক বিষাক্ত কামড় বসাচ্ছিল।

সেই সাম্বা ঝড় আর সামলাতে পারল না নীল সামুরাইরা। ৫৫ মিনিটে কাসেমিরো যখন মাথা ছুঁইয়ে বল জালে পাঠালেন, তা যেন ছিল এক পরম অভিজ্ঞতা আর নেতৃত্বের যুগলবন্দি। ধীরগতির বলে যাদের সমালোচনা সইতে হতো, সেই কাসেমিরো মনে করিয়ে দিলেন-বড় মঞ্চে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে অভিজ্ঞতার মূল্য ঠিক কতটা। এই এক গোল শুধু স্কোরবোর্ডের সংখ্যা বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল ম্যাচের পুরো মনস্তত্ত্ব। জাপানের রক্ষণ তখনো লড়ছিল বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাতে ধরেছিল এক অলক্ষ্য ফাটল।

তারপরও জাপান লড়েছে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে। তাদের গোলের প্রয়াস সংখ্যায় কম হলেও, প্রতিটি পাসে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়া। কিন্তু প্রতিপক্ষের নাম যখন ব্রাজিল, তখন তাকে একবার রুখে দেওয়া যায়, বারবার নয়। ম্যাচ যখন ধীরে ধীরে অতিরিক্ত সময়ের অতলান্তিকের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি লিখলেন এই মহাকাব্যের শেষ অনুচ্ছেদ।

ঘড়ির কাঁটায় তখন ৯৬ মিনিট। মার্তেনেল্লির পা থেকে বের হওয়া সেই শটটি শুধু জয়সূচক গোল ছিল না, ওটি ছিল এক রাজকীয় ঘোষণা-'শেষ বাঁশি বাজার আগে ব্রাজিল কখনো হার মানে না।' ফুটবল দেবতাও যেন তখন হিউস্টনের আকাশে মেঘের আড়ালে মুচকি হাসলেন। কারণ, ইতিহাস তো শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া বীরদের জন্যই নিজের দরজা খুলে দেয়।

না, এটি কোনো নিখুঁত, মসৃণ জয় ছিল না। এটি ছিল ঘামে ভেজা জয়, বুকের ভেতরের ধকধকানি আর ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এক জয়। আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে এই ফুটবল-কাব্যের আসল সৌন্দর্য। সময় হয়তো শুরু থেকে ব্রাজিলের পাশে ছিল না, কিন্তু নিজের গল্পটা রাজকীয়ভাবে লেখার জন্য সেলেসাওরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে জানত।

এই ব্রাজিল এখন আর শুধু অলীক জাদুর দল নয়, আবার পুরোপুরি যান্ত্রিকও নয়। ভিনিসিয়ুসের পায়ের মন্ত্র, কাসেমিরোর কঠিন দৃঢ়তা, মার্তিনেল্লির শেষের বিষ আর আনচেলত্তির বরফশীতল পরিকল্পনা-সব মিলিয়ে এ এক শিল্প ও বাস্তবতার অনন্য কোলাজ।

সামনে রাউন্ড অব সিক্সটিন, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনালের আরও নির্মম, আরও হিসেবি পথ। কিন্তু হিউস্টনের এই রাত সমর্থকদের কানে কানে এই ধ্রুবসত্যটি দিয়ে গেল-জাপান দেয়াল তুলে ব্রাজিলকে রুখতে চেয়েছিল, কিন্তু ব্রাজিলকে থামাতে হলে তো শুধু দেয়াল যথেষ্ট নয়, দরকার সময়কে থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা! সেটি সামুরাইরা পারেনি। তাই মাঠ ছাড়ার আগে ভিনিসিয়ুস-মার্তিনেল্লিরা যেন পুরো আকাশকে সাক্ষী রেখে বলে গেলেন-এই ক্ষ্যাপা ব্রাজিলকে রুখবে, এমন সাধ্য আর কার আছে!

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   ব্রাজিল  জাপান  সামুরাই  সেলেসাও 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: