দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের দক্ষিণাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত ‘তেমবেলিহলে’ নামক স্থানে গত রোববার স্থানীয় বাসিন্দারা এক অনানুষ্ঠানিক জরুরি সভায় মিলিত হন। দেশটিতে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের চলে যাওয়ার জন্য অভিবাসী-বিরোধী সক্রিয়বাদীরা ৩০ জুনের যে ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, তার মাত্র দুই দিন আগে এই সভা অনুষ্ঠিত হলো।
উগ্র বর্ণবাদ ও বিদেশি-বিদ্বেষী (জেনোফোবিক) সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করা তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন ‘তেমবেলিহলে ক্রাইসিস কমিটি’ এই সভার আয়োজন করে। সংগঠনের নেতারা জানান, দেশজুড়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বিদেশি নাগরিকদের ওপর যেন কোনো হামলা না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়দের নিরুৎসাহিত করাই ছিল এই সভার মূল লক্ষ্য।
মালাউই থেকে আসা শঙ্কিত অভিবাসীসহ প্রায় ৩০০ জন মানুষ এই সভায় অংশ নেন। তবে সভায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দেয়। কিছু বক্তা বিদেশিদের ওপর চড়াও না হওয়ার আহ্বান জানালেও, অন্যরা অপরাধ ও সামাজিক সমস্যার জন্য সরাসরি অভিবাসীদের দায়ী করেন। একপর্যায়ে বিদেশিদের দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ার দাবির পক্ষে গ্যালারির একটি অংশ থেকে তুমুল তালি ও উল্লাসধ্বনি আসতে দেখা যায়।
সভা শেষ হতে না হতেই পার্ক স্টেশন এলাকায় এক মালাউই নাগরিককে ছুরিকাঘাত করার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে এটি সাধারণ অপরাধ নাকি অভিবাসী-বিদ্বেষী হামলা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন লিফলেটে ছড়ানো এই ‘৩০ জুনের ডেডলাইন’ প্রবাসী ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম ভীতি তৈরি করেছে। কিছু ভুয়া নোটিশে দাবি করা হয়েছিল, অবৈধ অভিবাসীরা ৩০ জুনের মধ্যে দেশ না ছাড়লে তাদের গ্রেপ্তার ও দেশান্তর করা হবে। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার অবশ্য এই নোটিশগুলোকে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। জোহানেসবার্গে মালাউই দূতাবাসের সামনে জড়ো হওয়া হাজারো অভিবাসী এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সেখানে বাসের অপেক্ষায় থাকা এক মালাউই নাগরিক বলেন, ৩০ জুনের আগে দেশে ফিরতে না পারলে ওরা আমার পরিবারকে মেরে ফেলবে। জেমস ম্যাকি নামের এক মালাউই নাপিত বলেন, প্রতিবেশীরা বলছে, ৩০ জুনের পর রক্তগঙ্গা বইবে।
অভিবাসী-বিরোধী প্রচারণার পেছনে থাকা ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ নামের একটি সংগঠনের দাবি— তাদের আন্দোলন বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে নয়, বরং অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাসিন্টা এনগোবেসে-জুমা বলেন, ন্যায্য অধিকারের পক্ষে কথা বললেই আমাদের ‘বিদেশি-বিদ্বেষী’ বলা যায় না।
তবে এই আন্দোলনের সূত্র ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। মোসেল বে-তে মোজাম্বিকান এবং পিটারমারিৎজবার্গে এক মালাউই নাগরিককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সোয়েটো ও ডারবানেও তীব্র বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। অপারেশন দুদুলা’র মতো কট্টরপন্থী গ্রুপগুলোও চার্চ ও অন্যান্য সংস্থাকে অভিবাসীদের সাহায্য না করার জন্য চাপ দিচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সদস্যদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মন্ত্রী ফিরোজ কাচালিয়া।
অভিবাসন বিষয়ক আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রধান মন্ত্রী মামোলোকো কুবায়ি জানান, সরকার আইনশৃঙ্খলার বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর এবং যারা স্বেচ্ছায় দেশ ফিরে যেতে চান, তাদের সহায়তা করা হচ্ছে। তবে কোনো শরণার্থী বা ট্রানজিট ক্যাম্প তৈরি করা হবে না।
জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লুক সিনওয়েল আল জাজিরাকে বলেন, বেকারত্ব, অপরাধ ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা থেকে তৈরি হওয়া স্থানীয়দের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে এখন উসকে দিয়ে অভিবাসীদের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। তবে ডেডলাইনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি থাকতেও দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এক স্থানীয় বাসিন্দা সরাসরিই হুমকি দিয়ে বলেন, ওরা যদি নিজে থেকে না যায়, আমরা ওদের তাড়াব।
সময়ের আলো/কহু