পৃথিবীর জীবন পরীক্ষার ক্ষেত্র। এখানে মানুষের সচ্ছলতা বা অভাব সবই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নিগূঢ় পরীক্ষা। আল্লাহ তায়ালা যাকে সম্পদ দিয়ে ধন্য করেছেন, তিনি তাকে পরীক্ষার মুখোমুখি করেছেন কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে; আবার যাকে অভাবের কষ্টিপাথরে যাচাই করছেন, তাকে রেখেছেন ধৈর্য ও কর্মপ্রচেষ্টার পরীক্ষায়। ইসলাম কখনো আলস্য বা অকর্মণ্যতাকে প্রশ্রয় দেয় না, বরং অভাবমুক্ত সম্মানজনক জীবন গড়ার জন্য ইসলামি শরিয়ত সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। দারিদ্র্য জয় করে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে একজন মুমিনের করণীয় কী এবং পবিত্র কুরআন ও হাদিস এ বিষয়ে কী বার্তা দেয় তা নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।
আল্লাহ তায়ালার বানানো ধনী-গরিব শ্রেণির প্রভেদের অর্থ এই নয় যে, মানুষ অকর্মণ্য হয়ে ইচ্ছাকৃত দারিদ্র্য গ্রহণ করবে। বরং উচিত হবে, বৈধ সীমারেখার ভেতরে জীবনের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য অর্জনের চেষ্টা করা। কারণ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘দারিদ্র্য কখনো কখনো কুফরিতে নিমজ্জিত করে’ (শুয়াবুল ঈমান)। দারিদ্র্যতা দূরীকরণে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।
নানাবিধ মাধ্যম প্রয়োগ করে দারিদ্র্যতা নির্মূলের চেষ্টা করেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের আর্থিক বৈষম্য মুছে ফেলতে একদিকে যেমন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি ও নিজ হাতে উপার্জন করার প্রতি ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেছে, তেমনি ধনী শ্রেণির ওপর আর্থিক ইবাদতের বিধান আরোপ করেছে। উভয়ের সামষ্টিক বাস্তবায়নেই সমাজ-রাষ্ট্র থেকে দারিদ্র্যতা দূর হতে পারে। সমাজ ও রাষ্ট্রের অবস্থা বিবেচনায় ইসলাম দারিদ্র্যতা দূর করার জন্য বিশেষ মূলনীতি গ্রহণ করেছে।
আরও পড়ুন
পবিত্র কুরআন ও হাদিসে শ্রম বিনিময়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। জনজীবনে শ্রমের প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নামাজ শেষ হয়ে গেলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকার) সন্ধান করো। যাতে তোমরা সফলকাম হও’ (সুরা জুমা : ১০)। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম জাতিকে নামাজ আদায়ের পরেই নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন পূর্ণ করার লক্ষ্যে রিজিক তালাশের আদেশ করেছেন। পবিত্র কুরআনের মতো হাদিস শরিফের দিকে দৃষ্টিপাত করলেও আমরা দেখতে পাই, রাসুল (সা.) দারিদ্র্যতা দূর করার প্রতি সীমাহীন গুরুত্বারোপ করেছেন। মুসলমানদের উপার্জনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিজ হাতে উপার্জন করে খাদ্য গ্রহণের চেয়ে উত্তম খাবার মানুষের আর হতে পারে না। দাউদ (আ.) স্বহস্তে উপার্জন করে জীবন ধারণ করতেন’ (বুখারি : ২০৭২)। এই হাদিসে স্বহস্তে উপার্জনের গুরুত্ব ও দারিদ্র্য সমস্যার সরাসরি সমাধান রয়েছে। নবীগণ পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও বেকার অবস্থায় জীবন ধারণ করেননি, বরং নিজ হাতে উপার্জন করে জীবন অতিবাহিত করেছেন।
অপরদিকে ধনীদের সম্পদে আল্লাহ তায়ালা গরিবদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ধনীদের সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট একটি পরিমাণ গরিবদের মালিকানায় দেওয়ার মাধ্যমে ইসলাম দারিদ্র্যতা নির্মূল করার প্রয়াস চালিয়েছে। দারিদ্র্যতা দূরীকরণে জাকাত ইসলামের দ্বিতীয় পন্থা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(হে নবী!) তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করো, যার মাধ্যমে তুমি তাদের পবিত্র করবে এবং যা তাদের পক্ষে বরকতের কারণ হবে’ (সুরা তওবা : ১০৩)। আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করার লক্ষ্যে এবং বিপুল পরিমাণ সওয়াব অর্জন করার উদ্দেশ্যে গরিব-দুঃখীদের দান-সদকা করা। বিত্তশালী ব্যক্তিদের নিজেদের অঢেল সম্পদ থেকে সামর্থ্য পরিমাণ সম্পদ দীনহীনদের দানে উৎসাহ করার মাধ্যমে ইসলাম দারিদ্র্যতা দূর করার চেষ্টা করেছে। মানুষের উচিত এসব মূলনীতি অনুসরণ করে সমাজ থেকে অসচ্ছলতা দূর করার আপ্রাণ চেষ্টা করা।
এএডি/