ফুটবল কখনো কখনো কেবল একটা খেলা নয়, এটি আসলে ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক চরম প্রতিশোধের মঞ্চ। বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট, চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি যখন হিউস্টনের সবুজ ঘাসে টাইব্রেকারের ভাগ্য-পরীক্ষায় নামল, তখন তাদের পেছনে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিশ্বকাপের এক অজেয় রেকর্ড—ইতিহাসে এর আগে চারবার পেনাল্টি শুটআউটে গিয়ে চারবারই জিতেছিল তারা। অন্যদিকে, প্যারাগুয়ে? লাতিন আমেরিকার এই দেশটির ফুটবল ইতিহাস মানেই তো বুকভাঙা কষ্ট, সংগ্রাম আর অবহেলার বিরুদ্ধে লড়াই।
কিন্তু ফুটবল দেবতা এবার আর দীর্ঘশ্বাসের গল্প লিখতে চাননি। ১২০ মিনিটের ১-১ গোলের সমতা শেষে, শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকারে জার্মানিকে ৪–৩ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ১৬-র টিকিট ছিনিয়ে নিল প্যারাগুয়ে। ফেবারিটের তকমা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে বিদায় নিল বিদায় নিল অজেয় জার্মানরা।
এক যুগ পর ফেরা এবং এক নিমেষের পতন
২০১৪ সালে মারাকানায় বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকেই জার্মানির ফুটবলে যেন ভর করেছিল এক দীর্ঘ অমাবস্যা। টানা দুই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। এবার অবশ্য এক যুগ পর এক ম্যাচ হাতে রেখেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছিল তারা। চারধারে যখন স্লোগান উঠছিল 'জার্মান মেশিনের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন', ঠিক তখনই তাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল প্যারাগুয়ে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্যারাগুয়ের ফুটবল মানেই এক বুক রক্ত আর মাঠের বুকে শেষবিন্দু দিয়ে লড়াই করার ঐতিহ্য। তারা হয়তো পেলের ব্রাজিলের মতো জাদুকরী নয়, কিংবা ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার মতো আলো ঝলমলে নয়; কিন্তু তাদের আছে ইস্পাত-কঠিন রক্ষণ আর লড়াকু মানসিকতা। সেই লড়াকু মানসিকতার সামনেই ১২০ মিনিট ধরে মুখ থুবড়ে পড়ল জার্মানির সব যান্ত্রিক পরিকল্পনা।
গোলপোস্টের নিচে গিলের বীরত্ব আর নাটকের শুরু
টাইব্রেকার শুরু হতেই যেন বোস্টনের স্টেডিয়ামে নেমে এল পিনপতন নীরবতা। প্রথম শট নিতে এলেন জার্মানির কাই হ্যাভার্জ। কিন্তু প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক গিল যেন সেদিন কোনো অতিপ্রাকৃতিক শক্তির বর পেয়েছিলেন! হ্যাভার্জের জোরালো শট দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দিলেন তিনি। এরপর মাউরিসিও কোনো ভুল না করে বল জালে পাঠাতেই ১-০ তে এগিয়ে গেল প্যারাগুয়ে।
দ্বিতীয় শটে জার্মানির জোশুয়া কিমিখ গোল করলেও, প্যারাগুয়ের গুস্তাভো গোমেজও সফল কিকে ব্যবধান ২-১ রাখেন। তৃতীয় শটে জামাল মুসিয়ালা জার্মানিকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখলেন, কিন্তু প্যারাগুয়ের মাতিয়াস গালারজাও লক্ষ্যভেদ করতে ভুল করেননি। ৩-২ ব্যবধানে তখনো এগিয়ে লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিরা।
নয়্যার বনাম গিল: স্নায়ুযুদ্ধের চরম মুহূর্ত
চতুর্থ রাউন্ডে এসে আবারও দৃশ্যপটে নায়ক গিল। এবার নিকো ওল্টারমেডের নিচু শটটি রুখে দিয়ে জার্মানিকে দ্বিতীয়বারের মতো স্তব্ধ করে দিলেন এই প্যারাগুয়েন প্রাচীর। পরের শটে গোল করলেই ম্যাচ প্যারাগুয়ের। কিন্তু ফুটবল বিধাতা নাটক আরও বাকি রেখেছিলেন; অ্যান্তনিও সানাবরিয়া বল মারলেন পোস্টের বাইরে!
পঞ্চম শটে নাদিয়েম আমিরি গোল করে জার্মানিকে বাঁচিয়ে রাখলেন। এবার পেনাল্টি ঠেকাতে এলেন জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার। অভিজ্ঞতার সবটুকু ঢেলে দিয়ে বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে ফ্যাবিয়ান বালবুয়েনার শট রুখে দিলেন তিনি! জার্মানি তখন অলৌকিক কিছুর স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেন না টাহ। তাঁর শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে আকাশ ছুঁতেই জার্মানির ডাগআউটে নেমে এল কান্নার রোল।
জোসে ক্যানেলের সেই শট আর ইতিহাসের নতুন পাতা
দুই দুইবার ম্যাচ শেষ করার সুযোগ নষ্ট করেও ভেঙে পড়েনি প্যারাগুয়ে। লাতিন আমেরিকার এই দলটি তো শত প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে বাঁচার মন্ত্র জানে। শেষ শটটি নিতে এলেন জোসে ক্যানেল। পুরো প্যারাগুয়ের কোটি মানুষের প্রার্থনা তখন তাঁর পায়ে। ক্যানেলের শক্তিশালী শটটি যখন জার্মানির জাল কাঁপিয়ে দিল, তখন যেন বোস্টনের আকাশ ভেঙে পড়ল লাতিন উল্লাসে।
টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলের এই ঐতিহাসিক জয় কেবল জার্মানিকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ই করে দিল না, বরং বিশ্বকে মনে করিয়ে দিল—ফুটবল মাঠে কেবল নাম আর ইতিহাস দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না, দিনশেষে জয়টা তাদেরই হয় যারা বুকের ভেতর লড়াইয়ের আগুন নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টিকে থাকে। প্যারাগুয়ের ফুটবল-সংগ্রামের ইতিহাসে এই রাতটি সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে চিরকাল।
সময়ের আলো/আরবিএন