দুই যুগের অভিশাপ মুক্তি : ইতিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্রাজিলের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

ফুটবল মাঠে ইতিহাস কখনো কখনো ভারী এক পাথরের মতো চেপে বসে বুকের ওপর। হিউস্টনের সবুজ গালিচায় যখন ম্যাচের ২৯তম মিনিটে

2026-06-30T06:04:44+00:00
2026-06-30T06:15:26+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
খেলা
দুই যুগের অভিশাপ মুক্তি : ইতিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্রাজিলের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ৬:০৪ এএম  আপডেট: ৩০.০৬.২০২৬ ৬:১৫ এএম
সংগৃহীত ছবি
ফুটবল মাঠে ইতিহাস কখনো কখনো ভারী এক পাথরের মতো চেপে বসে বুকের ওপর। হিউস্টনের সবুজ গালিচায় যখন ম্যাচের ২৯তম মিনিটে জাপানের কাইশু সানো দূরপাল্লার এক শটে ব্রাজিলের জাল কাঁপিয়ে দিলেন, তখন গ্যালারির হলদে সমুদ্রে শুধু নীরবতাই নামেনি, নামল এক চেনা আতঙ্কের ছায়া। ব্রাজিলের ফুটবলারদের চোখের সামনে তখন যেন ভেসে উঠছিল গত ২৪ বছরের এক অলিখিত অভিশাপের স্মৃতি।

কারণ, পরিসংখ্যানের নিষ্ঠুর খাতা বলছিল-বিগত দুই যুগ ধরে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একবার প্রথম গোল হজম করলে, আর কখনোই ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়তে পারেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা!

২৪ বছরের সেই চেনা অন্ধকার

ইতিহাসের সেই ভূত ব্রাজিলকে হাড়ে হাড়ে তাড়া করেছে এই সেদিনের অতীতগুলোতেও। ২০০২ সালের পর থেকে নকআউট পর্বে প্রথমে পিছিয়ে পড়ার পর আর ভাগ্য সহায় হয়নি সেলেসাওদের। ২০০৬-এ জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স, ২০১৪-র সেই ঘরের মাঠে জার্মানি, কিংবা ২০১৮-তে বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্ম—প্রথম গোল হজম করার পর প্রতিবারই ব্রাজিলকে বিদায় নিতে হয়েছে মাথা নিচু করে, অশ্রুসিক্ত চোখে।

মাঝে অবশ্য গ্রুপ পর্বে ২০০৬ সালে এই জাপানের বিপক্ষেই কিংবা ২০১৪ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও জিতেছিল তারা। কিন্তু নকআউটের ‘ডু অর ডাই’ মঞ্চে গেলেই যেন পা আটকে যেত এক অলক্ষ্য নিয়তির জালে।

টানেল পেরিয়ে এক নতুন রূপকথা

কিন্তু হিউস্টনের রাতটা যেন লেখা হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কালিতে। প্রথমার্ধের সেই ১-০ গোলের হতাশা নিয়ে যখন বিরতিতে গেল দল, ড্রেসিংরুমে তখন ক্ষোভ আর জেদের আগুন। বিরতির পর যখন তারা মাঠে ফিরল, ইতিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এক অদম্য পণ স্পষ্ট ছিল সবার চোখে।


৫৫ মিনিটে কাসেমিরোর সেই মায়াবী হেড জাপানের নীল দেয়াল ভেঙে যখন জালে জড়াল, তখন শুধু সমতাই ফেরেনি, ভাঙল দীর্ঘদিনের সেই মনস্তাত্ত্বিক জুজু। আর ম্যাচের একেবারে অন্তিমলগ্নে, যখন ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়েছে ৯৬ মিনিট, তখন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির সেই অবিস্মরণীয় জয়সূচক গোল! ২-১ ব্যবধানের এই মহাকাব্যিক জয়ে কেবল শেষ ষোলোর টিকিটই নিশ্চিত হলো না, ঘুচল দীর্ঘ ২৪ বছরের এক আক্ষেপ। ২০০২ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পিছিয়ে থেকেও জয়ের এক নতুন কীর্তি গড়ল কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা।

ফিরে দেখা সোনালী অতীত

অথচ ব্রাজিলের ফুটবল মানেই তো একসময় ছিল এমন রূপকথার মতো ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রতিপক্ষের আগে গোল করার পরও ম্যাচ নিজেদের করে নেওয়ার কীর্তি ব্রাজিল দেখিয়েছে মোট ১৫ বার। যার মধ্যে ৭টি এসেছে গ্রুপ পর্বে, আর বাকিগুলো নকআউট কিংবা তার পরের ধাপে।

এমনকি ব্রাজিলের পাঁচটি সোনালী ট্রফির দুটিই এসেছে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এমন নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের হাত ধরে!

১৯৫৮ সালের ফাইনাল: স্বাগতিক সুইডেন শুরুতেই গোল করে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রাজিলকে। কিন্তু এরপর ভাভা, পেলে আর জাগালোর পায়ের জাদুতে ৫-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরেছিল সেলেসাওরা।

১৯৬২ সালের ফাইনাল: ঠিক চার বছর পর চেকোস্লোভাকিয়া প্রথমে লিড নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল শিরোপার। কিন্তু আমারিল্ডো, জিতো আর ভাভার গোলে ৩-১ ব্যবধানে জিতে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বজয় করে ব্রাজিল।

এই গৌরবান্বিত পথের শুরুটা হয়েছিল সেই ১৯৩৮ বিশ্বকাপে, যেখানে চেকোস্লোভাকিয়া ও সুইডেনের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও জয় ছিনিয়ে এনেছিল লাতিন আমেরিকার পরাশক্তিরা। এরপর ১৯৭০-এর মহাকাব্যিক আসরে চেকোস্লোভাকিয়া ও উরুগুয়ের বিপক্ষে এবং ১৯৮২ সালের সেই ধ্রুপদী টুর্নামেন্টে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমে গোল হজম করেও জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল জিকো-সক্রেটিসদের সেই সোনালী দল।

বৃত্তপূরণের রাত

২০০২ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মাইকেল ওয়েনের গোলে পিছিয়ে পড়ার পর রিভালদো আর রোনালদিনিওর সেই বিখ্যাত ফ্রি-কিকের জাদুতে ২-১ গোলে জিতেছিল ব্রাজিল। দীর্ঘ দুই যুগ পর, হিউস্টনের আকাশে ঠিক একই স্কোরলাইনে জাপানের বিপক্ষে যেন সেই বৃত্তটাই পূরণ করল নতুন প্রজন্মের সেলেসাওরা।

ইতিহাস যেখানে বারবার হাতছানি দিয়ে ভীতি ছড়াচ্ছিল, মার্তিনেল্লি-কাসেমিরোরা সেখানে দাঁড়িয়ে যেন এক নতুন ইতিহাস লিখে দিলেন। এই জয় শুধু একটা ম্যাচের জয় নয়, এটি আসলে দুই যুগের জমে থাকা এক দীর্ঘশ্বাসকে আনন্দের সাম্বা নৃত্যে রূপ দেওয়ার রাত!

সময়ের আলো/আরবিএন


  বিষয়:   ব্রাজিল  প্রত্যাবর্তন  নকআউট 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: