হিউস্টনের মাঠজুড়ে তখন যেন এক টর্নেডো বয়ে যাচ্ছিল। বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের হাইভোল্টেজ ম্যাচে জাপানের মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল। আর সেই ম্যাচে সেলেসাওদের আক্রমণের ধার দেখে গ্যালারিতে বসা লাখো দর্শক কেবল বুদ হয়ে রইলেন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চে। আক্রমণের আসল সৌন্দর্য যে লুকিয়ে থাকে গতিতে, তা যেন কাল রাতে ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে মনে করিয়ে দিল সাম্বার দেশ।
সেই গতির ঝড়ের কেন্দ্রে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী তারকা ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। মাঠের বাঁ প্রান্ত ধরে চিতার মতো যখন তিনি বল নিয়ে ছুটছিলেন, জাপানি ডিফেন্ডাররা তখন কেবল তাঁর ছায়া তাড়া করতেই ব্যস্ত। ম্যাচের পর ফিফার অফিশিয়াল ডেটার ওপর ভিত্তি করে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবো’ যখন পরিসংখ্যান প্রকাশ করল, তখন চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! দেখা গেল, ম্যাচের একটি মুহূর্তে ভিনির সর্বোচ্চ গতি রেকর্ড করা হয়েছে ঘণ্টায় ৩৩.২ কিলোমিটার।
গতিদানব যখন ডিফেন্ডার
তবে ভিনির এই অতিমানবীয় গতিকেও ছাড়িয়ে গিয়ে আসল চমকটা দেখিয়েছেন দলের ৩২ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার মার্কিনিওস। নিজের রক্ষণভাগ সামলে সুযোগ বুঝে যখন তিনি প্রতিপক্ষের সীমানায় ওভারল্যাপ করে ওপরে উঠছিলেন, তখন গতির কাঁটা ছুঁয়ে ফেলেছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩৩.৮ কিলোমিটার! গতির এই প্রতিযোগিতায় আক্রমণভাগের তরুণদেরও যেন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিলেন এই ডিফেন্ডার।
ব্রাজিল দলের গতিদানবদের তালিকাটা অবশ্য এখানেই শেষ নয়। তাঁদের ঠিক পেছনেই ঘণ্টায় ৩৩.০ কিলোমিটার গতিতে ঝড় তুলেছিলেন মিডফিল্ডার গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। আর সেলেসাওদের নতুন সেনসেশন তরুণ এনদ্রিকের গতি রেকর্ড করা হয় ৩২.৪ কিলোমিটার। গতির তীব্রতায় কম যাননি দানিলো এবং রায়ানও, দুজনই সমান ৩১.৬ কিলোমিটার গতিতে মাঠ কাঁপিয়েছেন।
মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা লুকাস পাকেতাও ঘণ্টায় ৩০.৯ কিলোমিটার গতিতে নিজের জাত চিনিয়েছেন। তবে দলের এই টর্নেডো গতির মাঝে কিছুটা ধীরস্থির ফুটবল খেলেছেন দগলাস সান্তোস ও মাতেউস কুনিয়া। ম্যাচে তাঁদের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল যথাক্রমে ২৯.৫ এবং ২৯.১ কিলোমিটার।
মাঠ চষে বেড়ানো এক ক্লান্তিহীন যাযাবর
গতির দিক থেকে মার্কিনিওস বা ভিনিসিয়ুস লাইমলাইট কেড়ে নিলেও, পুরো ম্যাচে জাদুকরী এক ম্যারাথন উপহার দিয়েছেন ব্রুনো গিমারাইস। এই মিডফিল্ডার যেন পায়ে অদৃশ্য কোনো চাকা লাগিয়ে মাঠে নেমেছিলেন! ক্লান্তি কাকে বলে তা ভুলে পুরো ১২০ মিনিট মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। পরিসংখ্যান বলছে, পুরো ম্যাচে তিনি একাই পাড়ি দিয়েছেন ১২.১৭ কিলোমিটার পথ, যা দলের মধ্যে সর্বোচ্চ।
দূরত্ব অতিক্রম করার এই লড়াইয়ে গিমারাইসের ধারেকাছেও কেউ ছিলেন না। তাঁর পেছনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা দগলাস সান্তোস দৌড়েছেন ১০.৯৬ কিলোমিটার। এছাড়া মাঠজুড়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১০ কিলোমিটারের বেশি পথ পায়ে হেঁটে ও দৌড়ে পার করেছেন ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস (১০.৫৬ কিমি) এবং রায়ান (১০.২৪ কিমি)।
গুরুত্বপূর্ণ গোল করে সেলেসাওদের ম্যাচে ফেরানো অভিজ্ঞ মাঝমাঠের কাণ্ডারি কাসেমিরোকেও দলের প্রয়োজনে ছুটতে হয়েছে ৯.৭৫ কিলোমিটার পথ। আর আক্রমণভাগে গতির ঝড় তোলা ভিনিসিয়ুস নিজে রক্ষণ ও আক্রমণের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে মোট ৯.২৭ কিলোমিটার পথ চষে বেড়িয়েছেন।
হিউস্টনের এই রাতটি কেবল ব্রাজিলের জয়ের গল্পই লেখেনি, বরং ফুটবলারদের গতি আর অবিশ্বাস্য শারীরিক সক্ষমতার এক অনন্য রূপকথা হয়ে রইল ফুটবল ইতিহাসের পাতায়।
সময়ের আলো/আরবিএন