১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত আলহাজ জুট মিল একসময় ছিল সরিষাবাড়ী অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান ছিল এই মিলকে কেন্দ্র করে। পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে ৩৯ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানটি একসময় দেশের ‘দ্বিতীয় ডান্ডি’ হিসেবে পরিচিত ছিল।
১৯৮২-৮৫ সালে সরকারের সঙ্গে চুক্তির আওতায় মিলটির মালিকানায় পরিবর্তন আসে। তখন ৪১ শতাংশ শেয়ার সরকারের এবং ৫৯ শতাংশ সাবেক মালিকদের হাতে থাকে। একসময় এখানে বছরে প্রায় ৩ লাখ মণ পাট কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। শুরুতে একটি ইউনিট থাকলেও পরবর্তীতে চাহিদা বাড়ায় আরও একটি ইউনিট যুক্ত করে মোট দুটি ইউনিটে উৎপাদন চলতো। উৎপাদিত সুতা, সুতলি, চট ও চটের বস্তা রপ্তানি করে অর্জিত হতো বৈদেশিক মুদ্রা।
কিন্তু ২০১৮ সালের ২০ জুলাই দিবাগত রাতে (২১ জুলাই) প্রায় ৮০ কোটি টাকা লোকসান এবং ১৫ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে মিলটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি এবং সরবরাহকারীদের পাওনা মিলিয়ে প্রায় ১৫ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
ব্যাংকের পর্যাপ্ত সিসি সুবিধা না পাওয়া, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং তৎকালীন সিবিএ নেতাদের অনিয়ম সব মিলিয়ে মিলটি বন্ধ হয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই শ্রমিকরা বেকার জীবনযাপন করছেন। অনেকেই বেতন-বোনাস না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মিলের ভেতরে যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়া এবং চুরির ঘটনাও বাড়ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ ও নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি নজরদারি থাকলে মিলটি আবারও চালু করা সম্ভব।
নারী শ্রমিক সাবিনা বেগম বলেন, মিল চালু থাকলে সপ্তাহে ৩ হাজার টাকা আয় হতো। সংসার ভালো চলতো। এখন বেকার সময় কাটাচ্ছি। চালু হলে আমাদের মতো নারীদের জন্য বড় সুযোগ হবে।
শ্রমিক মনির হোসেন বলেন, এই মিলই ছিল আমাদের পরিবারের আয়ের উৎস। এখন ওয়েল্ডিংয়ের দোকান দিয়েছি। মিল চালু হলে আবার কাজ করতে চাই।
মোজাম্মেল হক বলেন, মিল বন্ধ হলে দিশেহারা হয়ে কুমিল্লায় গিয়ে চাকরি করেছি, কিন্তু খরচের পর কিছুই থাকে না। এখন রাজমিস্ত্রির জোগালি দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।
অটোচালক আলমগীর বলেন, আগে মিলে কাজ করতাম,ভালো আয় ছিল। এখন অটো চালিয়ে কোনোভাবে বাঁচছি।
ভ্যানচালক আলম মিয়া বলেন, আগে শ্রমিকদের ভাড়া পেতাম, এখন সেই আয় নেই।
মুদি দোকানি রাখাল জানান, আগে সপ্তাহে যা বিক্রি হতো, এখন মাসেও তা হয় না। ছোটখাটো হোটেল ও দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।
পাট ব্যবসায়ী ফজলুল হক বলেন, মিলে পাট বিক্রি করে ভালো লাভ হতো। এখন দূরে পাট পাঠাতে ভয় লাগে। মিল চালু হলে আবার ব্যবসা শুরু করবো।
মিলের সহকারী হিসাব কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী খান জানান, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কয়েক কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। মিল সচল হলে তা সমন্বয় করা সম্ভব। তবে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না। মিলটি লিজ বা ব্যাংক ঋণের আওতায় চালানো গেলে আবার লাভজনক হতে পারে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশিদ বলেন, ব্যাংকের সিসি সুবিধা না পাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। সরকার সহযোগিতা করলে আমরা পুনরায় চালুর জন্য প্রস্তুত। মিল চালু হলে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে এবং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ফিরে আসবে।
জামালপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপপরিচালক মোহাম্মদ শরীফ আলম জানান, গত বছর জেলায় ২৩ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে এবং উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। সরিষাবাড়ীর জুট মিল চালু হলে কৃষকরা সরাসরি এখানে পাট বিক্রি করতে পারবে,ফলে তারা বেশি লাভবান হবে এবং পাট চাষে আগ্রহ বাড়বে।
সময়ের আলো/আতা