জনপদের প্রাণ সেই তুরাগ নদী এখন কোটি টন বর্জ্যের ভাগাড়

মো. মিলটন খন্দকার, গাজীপুর

সারাদেশ

গাজীপুরে দিন দিন বাড়ছে দূষণের মাত্রা। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, ময়লা ও পলিথিনের আগ্রাসনে ক্রমেই মৃতপ্রায় হয়ে উঠছে তুরাগ নদী। খাল-বিল,

2026-06-30T22:11:22+00:00
2026-06-30T22:12:09+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
সারাদেশ
জনপদের প্রাণ সেই তুরাগ নদী এখন কোটি টন বর্জ্যের ভাগাড়
মো. মিলটন খন্দকার, গাজীপুর
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১০:১১ পিএম  আপডেট: ৩০.০৬.২০২৬ ১০:১২ পিএম
শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, ময়লা ও পলিথিনের আগ্রাসনে ক্রমেই মৃতপ্রায় হয়ে উঠছে তুরাগ নদী। ছবি : সময়ের আলো
গাজীপুরে দিন দিন বাড়ছে দূষণের মাত্রা। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, ময়লা ও পলিথিনের আগ্রাসনে ক্রমেই মৃতপ্রায় হয়ে উঠছে তুরাগ নদী। খাল-বিল, নালা, ক্যানেল সব জায়গাই প্রবাহিত হচ্ছে দূষিত পানি। বিষাক্ত দূষণের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা। নদীতে মাছ তো দূরের কথা জলজ প্রাণী পর্যন্ত নেই। উৎকট দুর্গন্ধ ও কালচে রঙের পানিতে গাজীপুর মহানগরীসহ উপজেলার স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। 

কয়েকশ ড্রেনেজ, খাল, নালা, ক্যানেল ও সেচ প্রকল্প থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টন বর্জ্য মিশ্রিত পানি এসে মিশছে তুরাগ নদীতে। শুধু শিল্পকলকারখানার বর্জ্য নয় সিটি করপোরেশনসহ নদীর আশপাশের বাড়িঘরের পয়নিষ্কাশনের বর্জ্যমিশ্রিত পানি সরাসরি ফেলা হচ্ছে তুরাগে। প্রশাসনের চোখের সামনে নদীতে দূষণ করা হলেও কার্যত কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ এলাকার বাসীর।

সরেজমিন দেখা যায়, নদীর পানি কালচে রং ধারণ করেছে। নদীর ওপর ভাসছে প্লাস্টিক, পলিথিন ও বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা। আশপাশে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানাগুলো থেকে কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় যে নদীতে ছিল এই জনপদের প্রাণ, আজ সেই নদীই হয়ে উঠেছে বিষাক্ত দূষণের উৎস। 

পানিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের কারণে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) মাত্রাতিরিক্ত কমে যায়। ফলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ও বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। খালের দূষিত ও বিষাক্ত পানি দিয়ে সেচ দেওয়ার কারণে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত ফলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এই দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের এক পরিদর্শনে তুরাগ নদ দূষণের ২২৪টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে শিল্পকারখানা ৫৪টি, খাল-নালা ৪২টি, গৃহস্থালি ও অন্যান্য ১১৫টি এবং হাটবাজার ১৩টি। তাদের মতে, এক নদীর দূষণ অন্য নদীতেও ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে সামগ্রিক জলপ্রবাহ ব্যবস্থাই ঝুঁকিতে পড়ছে।

গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী বিসিকের পূর্বদিকে শেষ সীমানা পাগাড় খেয়া ঘাটের পাশে বড় একটি নালা দিয়ে বিসিকের পানি পড়ছে তুরাগ নদীতে। সেখানে জাহিদুল নামের এক ব্যাক্তি বলেন, আগে এই নদীতেই গোসল করতাম, মাছ ধরতাম। এখন কাছে গেলেই এমন গন্ধ লাগে, দাঁড়ানো যায় না। পানিটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। নামার কথাও চিন্তা করা যায় না। 


অভিযোগ রয়েছে, গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলজুড়ে দিনের বেলায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকলেও রাত নামলেই যেন খুলে যায় দূষণের গোপন দুয়ার। কারখানার পাইপ দিয়ে বের হতে থাকে কালো, লালচে ও রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য, যা খাল-নালা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশছে তুরাগ নদী। অধিকাংশ কারখানায় তরল বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) থাকলেও সেগুলো সচল রাখা হয় না। খরচ বাঁচাতে গভীর রাতে বাইপাস লাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে খাল-নদীতে। 

টঙ্গী, বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ী, কড্ডা, বাইমাইল, পুবাইল ও বিসিক শিল্প এলাকার বিভিন্ন খাল ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও পানির রং কুচকুচে কালো, কোথাও নীলচে বা লালচে। পানির ওপর ভাসছে রাসায়নিক ফেনা, চারপাশে তীব্র দুর্গন্ধ। অনেক স্থানে খালের পানি এতটাই ঘন ও দূষিত যে, তা আর স্বাভাবিক পানি বলে মনে হয় না-বরং তরল বর্জ্যরে স্রোত মনে হয়। শিল্পাঞ্চলে কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য খাল ও নদীতে ফেলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুরে প্রায় দুই হাজারের বেশি পোশাক ও শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৮০টি ওয়াশিং কারখানায় ইটিপি স্থাপন করা হলেও বাস্তবে অনেকগুলোই অচল। অনেক মালিক খরচ বেশি হওয়ায় ইটিপি চালাতে অনীহা দেখান। ফলে গোপনে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় খালগুলোই এখন দূষণের প্রধান বাহক হিসেবে কাজ করছে। এসব খাল দিয়ে বয়ে যাওয়া বিষাক্ত পানি শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশছে তুরাগ, বাণারসহ আশপাশের নদীতে। ফলে নদীর পানি দিন দিন ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

দূষিত পানির প্রভাবে কৃষিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি বাড়িয়ে বিনা-ইটিপি’র কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে কারখানার মালিকদের পরিবেশবান্ধব উপায়ে বর্জ্য পরিশোধনের ব্যাপারে বাধ্য করা।

গাজীপুর নগরীর গাছা পলাশোনা এলাকার বাসিন্দা কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, তুরাগ নদী পানি আগে আমাদের জন্য আশীর্বাদ ছিল, এখন অভিশাপ হয়ে গেছে। এই পানি দিয়ে সেচ দিলে গাছের পাতা পুড়ে যায়, চারা নষ্ট হয়ে যায়। বাড়ি পাশে নিচু জমিতে আগে বছরে দুইটি ফলন হতো কিন্তু এখন কিছুই করতে পারছি না। আশপাশের কারখানার কালো পানির কারণে মাটি নষ্ট হয়ে গেছে। কোন কিছু লাগালেও ফসল ঠিকমতো বড় হয় না। সেখানকার পানি এখন পুরো বিষের মতো। ফসলের ফলনও কমে গেছে।

গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছু কারখানায় ইটিপি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও তা নেই। আবার যেসব কারখানায় ইটিপি আছে, খরচ বাঁচাতে সেগুলোও ব্যবহার করা হয় না। ফলে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদনদীতে গিয়ে পড়ছে। পানিতে বিভিন্ন রাসায়নিক মেশার কারণে কোথাও নীল, কোথাও লালচে, আবার কোথাও কুচকুচে কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত রূপ ধারণ করছে। অনেক স্থানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহও নেই।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, গাজীপুরের নদনদীগুলো ধারাবাহিকভাবে দূষিত হচ্ছে। এক নদীর দূষণ অন্য নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে, এমনকি ভূগর্ভস্থ পানিও দূষিত হচ্ছে। পানিতে লেড, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর মাত্রা বেড়ে মানবদেহ ও জলজ প্রাণীর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এ অঞ্চলে চর্মরোগ, ব্রঙ্কাইটিস ও শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব কারখানায় ইটিপি স্থাপন ও নিয়মিত চালনা নিশ্চিত করা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। গাজীপুর দূষণে সংকটাপন্ন হলে ঢাকাও এর প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে না, কারণ এটি রাজধানীর উজানের অঞ্চল।

দূষণের বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (বাপা) গাজীপুর মহানগরীর সভাপতি হাসান ইউসুফ খান বলেন, গাজীপুরে শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ কারখানায় ইটিপি থাকলেও তা নিয়মিত চালানো হয় না। এখনই কঠোর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ না করলে খাল-নদীগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।

গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফীন বাদল বলেন, অভিযোগ পেলে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। অনেক কারখানায় সিসিটি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। তবে সব কারখানাকে এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি, মনিটরিং আরও জোরদার করা হচ্ছে।

সময়ের আলো/আতা


  বিষয়:   জনপদ  প্রাণ  তুরাগ  নদী  বর্জ্য  ভাগাড়  গাজীপুর 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: