দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার গত ১২ আগস্ট শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাটের ব্যবসার সময়সূচি নির্ধারণ করে নতুন নির্দেশনা জারি করে। নির্দেশনায় বলা হয়, বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখা যাবে এবং রাত ৮টার মধ্যেই সব শপিংমল, মার্কেট ও ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড, ডিজিটাল সাইনবোর্ড, এলইডি ডিসপ্লে এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুতের অপচয় কমানো, জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ হ্রাস করা এবং জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করা। কিন্তু নির্দেশনা জারির তিন দিন পরও চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় তার কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। বরং উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারে রাত ৮টার পরও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক নিয়মেই খোলা ছিল। কোথাও প্রশাসনের তদারকি, সতর্কীকরণ, ভ্রাম্যমাণ আদালত কিংবা দৃশ্যমান কোনো অভিযান চোখে পড়েনি। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে— সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসনের ভূমিকা কোথায়?
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাত ৮টার পর সরেজমিনে কেরানীহাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তখনও খোলা। পোশাকের দোকান, মুদি দোকান, কসমেটিকস, ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল ফোনের দোকানসহ প্রায় সব ধরনের ব্যবসা আগের মতোই চলছিল। ক্রেতাদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক দোকানে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেচাকেনা আরও জমে ওঠে। বাজারজুড়ে বৈদ্যুতিক বাতির ঝলকানি দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য নতুন কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করেছে।
সরকারি নির্দেশনায় শুধু দোকানপাট নয়, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড ও আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ থাকলেও সাতকানিয়ার বিভিন্ন সড়ক, মার্কেট ও বাণিজ্যিক এলাকায় স্থাপিত এলইডি সাইনবোর্ড, ডিজিটাল ডিসপ্লে এবং আলোকিত বিজ্ঞাপন বোর্ড যথারীতি চালু ছিল। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সরকারি উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্দেশনা জারির পর থেকে এখন পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে বাজারগুলোতে নিয়মিত মনিটরিং কিংবা অভিযান পরিচালনা করা হয়নি।
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ দোকান বন্ধ করার বিষয়ে সরাসরি কোনো নির্দেশ বা সতর্কবার্তা দেননি। ফলে তারা আগের নিয়মেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যদি প্রথম দিন থেকেই প্রশাসন বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করত, মাইকিং করত অথবা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করত, তাহলে ব্যবসায়ীরা নির্দেশনা মেনে চলতেন। কিন্তু প্রশাসনের দৃশ্যমান ভূমিকা না থাকায় সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে।
সাতকানিয়ার সচেতন নাগরিকদের মতে, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের। কিন্তু নির্দেশনা জারির পরও মাঠপর্যায়ে কোনো কঠোরতা দেখা না যাওয়ায় সরকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না।
তাদের মতে, শুধু কাগজে নির্দেশনা জারি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক মনিটরিং, ব্যবসায়ীদের সচেতন করা, সময়মতো বাজার পরিদর্শন এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
সাতকানিয়ার ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে প্রতিদিন শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতান রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক বাতি, এসি, ফ্যান, আলোকিত সাইনবোর্ড এবং বিজ্ঞাপন বোর্ড জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। সরকার এই চাপ কমানোর লক্ষ্যেই নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করেছে। কিন্তু নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, ১২ আগস্ট নির্দেশনা জারি হওয়ার পরও কেন এখনো সাতকানিয়ায় কোনো দৃশ্যমান অভিযান পরিচালনা করা হয়নি? কেন রাত ৮টার পরও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হচ্ছে? কেন আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ হচ্ছে না?
তাদের মতে, প্রশাসন যদি শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিত, তাহলে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অনেক সহজ হতো।
এ বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, সরকারের জারি করা নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের নির্দেশনা অমান্য করে কেউ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই