কার্লো আনচেলত্তির প্রজ্ঞা, রণকৌশল এবং ব্রাজিল ফুটবলের পুনর্জাগরণ

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামের ঘড়ির কাঁটা তখন ৯৫ মিনিট ছুঁইছুঁই করছে। গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার হলুদ-সবুজ জার্সি পরিহিত সমর্থকের হৃদস্পন্দন তখন

2026-06-30T23:17:13+00:00
2026-06-30T23:17:13+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
খেলা
কার্লো আনচেলত্তির প্রজ্ঞা, রণকৌশল এবং ব্রাজিল ফুটবলের পুনর্জাগরণ
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১১:১৭ পিএম 
কার্লো আনচেলত্তি। সংগৃহীত ছবি
হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামের ঘড়ির কাঁটা তখন ৯৫ মিনিট ছুঁইছুঁই করছে। গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার হলুদ-সবুজ জার্সি পরিহিত সমর্থকের হৃদস্পন্দন তখন যেন থমকে গেছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে পরাশক্তি জাপানের মুখোমুখি হয়েছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। জাপানিদের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ এবং গতিশীল কাউন্টার-অ্যাটাকের সামনে প্রথমার্ধেই ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল সেলেসাওরা। মাঠের ভেতরে যখন চরম উৎকণ্ঠা, ডাগআউটে দাঁড়ানো ইতালীয় মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তির মুখের অভিব্যক্তি তখনো সম্পূর্ণ শান্ত, চোখের একটি ভ্রু চেনা ভঙ্গিমায় সামান্য উঁচানো। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কম হৃদস্পন্দনের এই ম্যানেজার পরিস্থিতিকে শান্ত করার এক জাদুকরী ক্ষমতা রাখেন। তিনি ভালো করেই জানতেন, তাড়াহুড়ো নয়, বরং ধৈর্য্য এবং সঠিক কাঠামোগত শৃঙ্খলা বজায় রাখলেই জয় আসবে। অবশেষে কাসেমিরোর সমতাসূচক গোলের পর অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলির সেই বাঁকানো শট যখন জাপানি গোলরক্ষককে পরাস্ত করে জালে জড়াল, তখন পুরো ব্রাজিল বেঞ্চ বন্য উল্লাসে মেতে উঠলেও আনচেলত্তি ছিলেন অবিচল, শান্ততার মূর্ত প্রতীক। 

মার্টিনেলির সেই গোলের পর তিনি উল্লাস না করে প্রথমে জাপানি দলের ভেঙে পড়া খেলোয়াড়দের বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দেন। এই একটি দৃশ্যই বলে দেয় কেন কার্লো আনচেলত্তি আজ বিশ্ব ফুটবলের এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপকার এবং কেন ব্রাজিলের মতো গৌরবময় কিন্তু পথহারা ফুটবল জাতি তাদের ষষ্ঠ নক্ষত্র জয়ের দায়িত্ব তার কাঁধেই তুলে দিয়েছে। 

​একটি ঐতিহাসিক ভ্রান্তি এবং কৌশলগত নমনীয়তার জন্ম

​কার্লো আনচেলত্তির আজকের এই শান্ত প্রজ্ঞা এবং নমনীয় রণকৌশল কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক ভুলের অনুশোচনা, যা তার ফুটবল দর্শনকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। 

​যখন ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আনচেলত্তি পার্মার দায়িত্ব নেন, তখন তার দলে ছিলেন জিয়ানলুইজি বুফন এবং ফাবিও ক্যানাভারোর মতো উদীয়মান তারকারা। সে সময় তিনি তার গুরু আরিকো সাকির কঠোর ৪-৪-২ ফর্মেশনের এক গোঁড়া অন্ধ অনুসারী ছিলেন। সেই দলে খেলা জিয়ানফ্রাঙ্কো জোলার মতো সৃজনশীল ফুটবলারকে নিজের ফর্মেশনে খাপ খাওয়াতে না পেরে তিনি উইংয়ে খেলান এবং শেষ পর্যন্ত তাকে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। এর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি ঘটে যখন ইতালির সর্বকালের অন্যতম সেরা প্লেমেকার রবার্তো বাজ্জিও পারমায় যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আনচেলত্তির কঠোর ৪-৪-২ ফর্মেশনে কোনো ট্র্যাকার্তিস্থা বা চিরাচরিত '১০ নম্বর' পজিশনের স্থান ছিল না। ফলে বাজ্জিওর মতো সৃষ্টিশীল জাদুকরকে দলে নিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। 

​পরবর্তীকালে আনচেলত্তি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বাজ্জিওকে দলে না নেওয়াটা ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো কঠোর গাণিতিক ছক বা ফর্মেশন কখনো খেলোয়াড়ের সহজাত প্রতিভার চেয়ে বড় হতে পারে না। একজন উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী ম্যানেজারের কাজ খেলোয়াড়দের জোর করে নিজের ট্যাকটিক্যাল ছকে বন্দি করা নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে খেলোয়াড়ের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা পায়। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় আনচেলত্তির বিখ্যাত উক্তি, ‘আমার দলের কোনো নির্দিষ্ট আইডেন্টিটি বা পরিচয় না থাকাটা কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, এটি একটি গুণ। আমি খেলোয়াড়দের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নিজেকে খাপ খাইয়ে নিই।’

​এই দর্শনই তাকে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার একমাত্র গৌরব এনে দেয় এবং এসি মিলান ও রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবগুলোকে এনে দেয় ঐতিহাসিক সব সাফল্য। 

ব্রাজিলের চিরচেনা ঝড়ের মাঝে এক প্রশান্ত দ্বীপ

​ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সমর্থকদের গগনচুম্বী প্রত্যাশা এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের অবিরাম সমালোচনা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সামাল দেওয়া অসম্ভব। এখানে ফুটবলের চাপ দেশের রাষ্ট্রপতির চেয়েও বেশি বলে গণ্য করা হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর আনচেলত্তি প্রথমেই যে কাজটি করেন, তা হলো তার সুপরিচিত ‘শান্ত নেতৃত্ব’ দিয়ে দলটির চারপাশে একটি মানসিক বর্ম বা "স্ট্রেস শিল্ড" তৈরি করা। 

​আনচেলত্তির এই শান্ত নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো সহানুভূতি, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং খোলামেলা আলোচনা। তিনি বিশ্বাস করেন, খেলোয়াড়রা যখন স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে, তখনই তারা তাদের সেরাটা দিতে পারে, কোনো মানসিক ভীতি বা অস্বস্তির মাঝে নয়। ড্রেসিংরুমে কোনো তারকা খেলোয়াড়ের সাথে দ্বিমত হলে তিনি চিৎকার না করে নির্জনে কথা বলতে পছন্দ করেন। তার মতে, ‘পাবলিকলি প্রশংসা করো, কিন্তু সমালোচনা করো আড়ালে’। 


​ব্রাজিলের তরুণ ও আবেগপ্রবণ খেলোয়াড়দের জন্য আনচেলত্তির এই শান্ত পিতৃতুল্য আচরণ অত্যন্ত কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে। রদ্রিগো থেকে শুরু করে ভিনিসিয়াস পর্যন্ত সবাই তাকে মাঠের বাইরে এক প্রকৃত গার্ডিয়ান বা অভিভাবক হিসেবে দেখেন। দলের মানসিক চাপ কমাতে তিনি খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ ‘কেয়ার টুলকিট’ এবং ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগের রাস্তা খোলা রেখেছেন। মাঠের বাইরে সমস্ত সমালোচনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তিনি নিজে শুষে নেন, যাতে তার দলের ফুটবলাররা মাঠে নামার সময় সম্পূর্ণ হালকা হৃদয়ে খেলতে পারে। 

​খেলোয়াড়দের সাথে কার্লো আনচেলত্তির দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের বিশ্বস্ততা এবং গভীরতা ফুটে ওঠে তার অধীনে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ থেকে। এই তালিকায় সর্বাগ্রে রয়েছেন কিংবদন্তি অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার কাকা, যিনি এসি মিলান ও রিয়াল মাদ্রিদে আনচেলত্তির অধীনে ২৭০টি ম্যাচ খেলেছিলেন এবং ২০০৭ সালে ব্যালন ডি'অর ও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় করেন। এর পরেই রয়েছেন বিশ্বখ্যাত গোলরক্ষক দিদা, যিনি মিলানের হয়ে ২৬৭টি ম্যাচ খেলেছিলেন আনচেলত্তির তত্ত্বাবধানে এবং দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও দুটি সেরি এ শিরোপা অর্জন করেন। তৃতীয় অবস্থানে আছেন আধুনিক প্রজন্মের ফরোয়ার্ড রদ্রিগো, যিনি রিয়াল মাদ্রিদ ও ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে এ পর্যন্ত ২০৮টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ইতিমধ্যে দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও লা লিগা জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। চতুর্থ স্থানে থাকা লেফট-ব্যাক ও উইঙ্গার সার্জিনহো এসি মিলানের হয়ে খেলেছিলেন ২০১টি ম্যাচ, যেখানে তার ঝুলিতে যুক্ত হয় সেরি এ এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি। আর পঞ্চম স্থানে আছেন ব্রাজিলের বর্তমান আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা ভিনিসিয়াস জুনিয়র, যিনি রিয়াল মাদ্রিদ ও জাতীয় দল মিলিয়ে ১৯৭টি ম্যাচে ইতালীয় এই কোচের রণকৌশলে অংশ নিয়ে খেলছেন এবং দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও লা লিগা জয় করেছেন। 

​রণকৌশলের লড়াই: পজিশনাল বনাম রিলেশনাল ফুটবল

​ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল শৈলীকে বলা হয় ‘জোগো বনিতো’ বা সুন্দর খেলা, যা মূলত সৃজনশীলতা, ড্রিবলিং এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু গত দুই দশকে ইউরোপীয় ফুটবলে পেপ গার্দিওলার হাত ধরে অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়া ‘পজিশনাল প্লে’ ফুটবলকে অনেক বেশি জ্যামিতিক এবং ছক-ভিত্তিক করে তুলেছে, যেখানে খেলোয়াড়দের নির্দিষ্ট জোনে অবস্থান ধরে রাখতে হয়। ব্রাজিলের সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন কোচ ফার্নান্দো দিনিজ সম্পূর্ণ বিপরীত এক ধারা নিয়ে আসেন, যাকে বলা হয় ‘রিলেশনাল ফুটবল’ বা সম্পর্কভিত্তিক খেলা; এই পদ্ধতিতে খেলোয়াড়রা মাঠে কঠোর নিয়ম মেনে না চলে ছোট ছোট ত্রিকোণ বা চতুষ্কোণ তৈরি করে নিজেদের মাঝে সংযোগ স্থাপন করে খেলেন। কিন্তু দিনিজের এই পদ্ধতিতে অতিমাত্রায় ঝুঁকি থাকায় তা ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে অরক্ষিত করে ফেলেছিল এবং ফলস্বরূপ তারা একাধিক ম্যাচে পরাজিত হয়। 

​কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলে এসে এই দুই চরমপন্থী দর্শনের মাঝে এক চমৎকার মধ্যপন্থা ও ভারসাম্য তৈরি করেন। তিনি ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ফাংশনাল বা রিলেশনাল ফুটবলের স্বাধীনতাকে সমর্থন করেন, তবে তা আরিকো সাকির মতো কঠোর রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলা ও স্পেস কম্প্রেশনের কাঠামোর মধ্যে রেখে। তিনি খেলোয়াড়দের পজিশনাল স্বাধীনতা দেন যাতে তারা মাঠের যেকোনো প্রান্তে গিয়ে বল ডিস্ট্রিবিউট করতে পারে, বিশেষ করে উইংগুলোতে রোটেশনাল মুভমেন্টের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে বিভ্রান্ত করতে পারে। 

​উদাহরণস্বরূপ, ব্রাজিলের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় এদের মিলিতাও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। আনচেলত্তির প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিরুদ্ধে ব্রাজিল মধ্যমাঠে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, কারণ ব্রুনো গুইমারেস এবং কাসেমিরোর ডাবল পিভট প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারছিল না। আনচেলত্তি তাৎক্ষণিকভাবে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে মতামত নেন এবং পরবর্তী ম্যাচগুলোতে ৪-৩-৩ ফর্মেশনে পরিবর্তন এনে মধ্যমাঠের সেই ফাঁকটি বন্ধ করেন। খেলোয়াড়দের এই স্বাধীনতা ও কোচের সাথে সরাসরি মতবিনিময়ের সংস্কৃতিই ব্রাজিলের মাঠের খেলায় নতুন প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে। 

​তারকাদের পুনরুজ্জীবন: কাকার স্মৃতি ও ভিনির রূপান্তর

​কার্লো আনচেলত্তির অন্যতম প্রধান গুণ হলো তিনি খেলোয়াড়দের মানসিকতা বুঝতে পারেন এবং তাদের সহজাত প্রতিভাকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যেতে পারেন। অতীতে এসি মিলানে কাকার সোনালী সময় গড়ে উঠেছিল আনচেলত্তির স্নেহে। কাকার গতি এবং ডিফেন্স চেরা পাসের ক্ষমতাকে আনচেলত্তি ৪-৩-২-১ ফর্মেশনে এক বিশেষ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। ২০০৭ সালের সেই অবিস্মরণীয় ব্যালন ডি'অর জয়ী কাকাকে এখন আনচেলত্তি ব্রাজিলের কোচিং স্টাফে তার সহকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চলেছেন, যা দলের তরুণদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। 

​তবে বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি ঘটেছে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের ক্ষেত্রে। রিয়াল মাদ্রিদে ভিনিসিয়াসকে বিশ্বসেরা খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার পর ব্রাজিলের জার্সিতেও তার সেরাটা বের করার চাবিকাঠি খুঁজে পেয়েছেন আনচেলত্তি। জাতীয় দলের হয়ে ভিনিসিয়াস দীর্ঘকাল ধরে উইংয়ের এক পাশে আটকে থাকতেন এবং প্রতিপক্ষের একাধিক ডিফেন্ডারের মুখোমুখি হয়ে বল হারাতেন। 

​আনচেলত্তি এসে তাকে উইং থেকে মাঠের মধ্যভাগে, অর্থাৎ গোলপোস্টের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। তিনি ভিনিকে বলেন, ​‘একজন উইঙ্গার হিসেবে গোল করতে তোমার ৩-৪টি ড্রিবল এবং ৭-৮টি টাচ লাগে। কিন্তু তুমি যদি সেন্ট্রাল পজিশনে চলে আসো, তবে মাত্র একটি সঠিক মুভমেন্টই গোলের জন্য যথেষ্ট।’ 

​এই পরিবর্তনের প্রভাব পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্ববর্তী কোচদের অধীনে যখন ভিনিসিয়াস জুনিয়র বাম উইংয়ে একটি নির্দিষ্ট ও কঠোর অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকতেন, তখন ৩৯টি ম্যাচে তার গোল সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি, যার গড় ম্যাচ প্রতি দাঁড়ায় ০.১৫ গোল। কিন্তু কার্লো আনচেলত্তির অধীনে তাকে যখন মাঠের মধ্যভাগে সেন্ট্রাল পজিশনে রূপান্তর করা হলো, তখন মাত্র ১৩টি ম্যাচে তিনি ৭টি গোল করতে সক্ষম হন, যেখানে তার ম্যাচ প্রতি গোলের গড় নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ০.৫৪ গোলের মতো চিত্তাকর্ষক সংখ্যায়। এই কৌশলগত পরিবর্তনই ভিনিকে আরও বেশি বিপজ্জনক এবং কার্যকর করে তুলেছে। 

​ভিনিসিয়াস নিজেই কৌতুক করে বলেছেন যে, আনচেলত্তির এই সিদ্ধান্ত তার গোল করার ক্ষুধাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ড্রেসিংরুমে গেলেই আনচেলত্তি তাকে বলেন যে তিনি ফুটবলটা একটু বেশিই বোঝেন। 

​হিউস্টনের মহাকাব্য

​২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ জাপানের বিরুদ্ধে সেই রোমাঞ্চকর জয়টি ছিল আনচেলত্তির দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার এক নিখুঁত প্রদর্শনী। জাপানের আঁটসাঁট ডিফেন্সের বিরুদ্ধে প্রথমার্ধে যখন ব্রাজিল ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে, তখন মাঠের সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু হাফটাইমে ড্রেসিংরুমে আনচেলত্তি কোনো রাগারাগি করেননি। তিনি শান্ত কণ্ঠে খেলোয়াড়দের প্রতি বিশ্বাসের কথা জানান এবং তাদের ধৈর্য ধরে আক্রমণ চালানোর পরামর্শ দেন। 

​ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো একবার আনচেলত্তির অতিরিক্ত অনুশীলনের চাপ সম্পর্কে একটি সুন্দর উক্তি করেছিলেন যা আনচেলত্তির ড্রেসিংরুমের দেওয়ালে খোদাই করা থাকে: ‘অতিরিক্ত জল গাছকে মেরে ফেলে’। আনচেলত্তিও সেই ম্যাচে অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম না করিয়ে খেলোয়াড়দের ট্যাকটিক্যাল পজিশন পরিবর্তনের মাধ্যমে স্পেস তৈরি করতে বলেন। 

​সেই ম্যাচে সবচেয়ে বড় কৌশলগত আলোচনা ছিল নেইমারকে ঘিরে। নেইমার সবেমাত্র চোট কাটিয়ে দলে ফিরেছিলেন এবং সারা বিশ্ব তাকে শুরুর একাদশে দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল। কিন্তু আনচেলত্তি আবেগ নয়, বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে নেইমারকে বেঞ্চে রাখেন। তিনি নেইমারকে ব্যক্তিগতভাবে বুঝিয়েছিলেন যে, যদি ৬০ মিনিটের মধ্যে ম্যাচ ড্র না হয় তবে তাকে নামানো হবে, আর যদি ম্যাচ ড্র থাকে তবে তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের জন্য ফ্রেশ লেগ হিসেবে হোস্টেজ না রেখে ছেড়ে দেওয়া হবে। 

​যদিও শেষ পর্যন্ত মার্টিনেলির অন্তিম মুহূর্তের গোলে ব্রাজিলের অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন পড়েনি, তবুও এই সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করে যে আনচেলত্তির কাছে কোনো নির্দিষ্ট তারকার চেয়ে পুরো দলের ভারসাম্য এবং খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচ চলাকালে সাইডলাইনে নেইমারের মাঠে নামার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সহকারী কোচ ও আনচেলত্তির পুত্র ডাভিদ আনচেলত্তির মাথা নাড়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে ব্যাপক জলঘোলা হয়েছিল। কিন্তু প্রধান কোচের প্রাজ্ঞ পরিচালনায় ড্রেসিংরুমের শান্ত পরিবেশ এবং সংহতি এক চুলও নষ্ট হতে পারেনি। 

​২০৩০ এবং তার পরবর্তী দিগন্ত: ব্রাজিলের চিরন্তন আশা

​ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের গৌরব পুনরুদ্ধার কেবল একটি বিশ্বকাপ জয় দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সিবিএফ সভাপতি সমীর শাউদ ২০১৬ সালের পর থেকে চলে আসা ব্রাজিলের ট্রফি খরা মেটাতে কার্লো আনচেলত্তির চুক্তি ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাড়িয়ে নিয়েছেন। ব্রাজিলের জাতীয় দল কেবল একজন বড় মাপের কোচই পায়নি, পেয়েছে এমন এক দার্শনিক দিকনির্দেশক যিনি ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের সাথে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলীয় সৌন্দর্যের মেলবন্ধন ঘটাতে পারেন। 

​কার্লো আনচেলত্তির এই শান্ত বিপ্লব ব্রাজিলের ফুটবলারদের মনে এক নতুন আত্মবিশ্বাস ও পারস্পরিক আনুগত্যের জন্ম দিয়েছে। তাদের খেলার মাঝে এখন আর সেই অস্থিরতা বা ভীতি নেই। ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বাস করেন, ডন কার্লোর শান্ত ছায়ার নিচে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সেই চিরচেনা সোনালী দিন এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী ফুটবলের আদি আত্মা আবারও মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বিশ্বমঞ্চে।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   কার্লো আনচেলত্তি  ব্রাজিল 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: