আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম কুদরত ও পরম করুণায় মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানোর আগেই তিনি আসমান-জমিন এবং সমগ্র বিশ্বজগৎকে সুপরিকল্পিতভাবে সাজিয়েছেন। চন্দ্র-সূর্য, নদ-নদী, বৃক্ষরাজি প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান তিনি মানুষের কল্যাণ ও উপকারের জন্য নিবেদন করেছেন।
মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যের জন্য। কবি যথার্থই বলেছেন, ‘এই পৃথিবী তোমার জন্য; তুমি পৃথিবীর জন্য নও।’ মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষের প্রয়োজনে দুনিয়ার অগণিত নিয়ামত দান করেছেন। তবে তাঁর প্রজ্ঞা ও হিকমতের দাবি অনুযায়ী, তিনি সবার রিজিক সমানভাবে বণ্টন করেননি।
কারও জন্য তিনি ধন-ভান্ডারের দ্বার অবারিত করেছেন, আবার কারও জীবিকা সীমিত ও সংকীর্ণ রেখেছেন। সম্পদের এই বৈচিত্র্যও কম-বেশির মধ্যে রয়েছে মানুষের ধৈর্য ও শুকরিয়ার পরীক্ষা। যারা অল্পে তুষ্ট থাকে এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকে, তাদের জন্য এ পৃথিবীই সুখ ও প্রশান্তির আবাসে পরিণত হয়।
সুখ-দুঃখের ভুল মাপকাঠি : আমরা সাধারণত সুখের মাপকাঠি নির্ধারণ করি ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের ভিত্তিতে। মনে করি, ধনীরাই প্রকৃত সুখী, আর অভাবি মানুষের জীবনে আনন্দের কোনো স্থান নেই। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যায়, কিন্তু প্রকৃত সুখ ও মানসিক প্রশান্তি কেনা সম্ভব নয়।
অনেক অঢেল সম্পদের মালিকের জীবনেও অশান্তি ও উদ্বেগের শেষ নেই। অন্যদিকে অল্পে তুষ্ট একজন মানুষ সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেও এমন প্রশান্তি লাভ করে, যা বিপুল অর্থ দিয়েও অর্জন করা যায় না। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত সচ্ছলতা হলো হৃদয়ের সচ্ছলতা, আর প্রকৃত দারিদ্র্য হলো হৃদয়ের দারিদ্র্য’ (সহিহ ইবনে হিব্বান)। মানুষের প্রকৃত সম্পদ তার ব্যাংক-ব্যালান্স নয়; বরং তার অন্তরের প্রশান্তি ও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি।
মানুষের স্বভাব ও বাস্তবতা : অর্থ-বিত্তের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সৃষ্টিগত ও স্বভাবজাত। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘নারী, সন্তান, স্বর্ণ-রৌপ্য ও শস্যক্ষেতের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সুশোভিত করা হয়েছে’ (সুরা আলে ইমরান : ১৪)।
রাসুল (সা.)-ও বলেছেন, ‘আদম সন্তানের যদি দুটি উপত্যকাভর্তি স্বর্ণও থাকে, তবু সে তৃতীয়টির আকাক্সক্ষা করবে’ (বুখারি)। ধন-সম্পদের প্রতি আকর্ষণ থাকা অস্বাভাবিক নয়, অস্বাভাবিক হলো এর দাসে পরিণত হওয়া। যারা এই প্রবল আকাক্সক্ষাকে সংযত করে ‘কানাআত’ বা অল্পে তুষ্টির মহৎ গুণ অর্জন করতে পারে, তাদের জন্য দুঃখ-কষ্টে ভরা পৃথিবীও প্রশান্তির জান্নাতে রূপ নেয়।
নবী জীবনে কানাআতের দৃষ্টান্ত : আমাদের জীবনের পরম আদর্শ হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন কানাআত ও সরলতার উজ্জ্বল প্রতীক। ভোগ-বিলাস তাঁর জীবনের অভিধানে ছিল না। এমনও সময় গেছে, যখন তাঁর ঘরে টানা কয়েক দিন চুলায় আগুন জ্বলেনি; তবু তাঁর মনে কোনো আক্ষেপ ছিল না।
সমগ্র হিজাজের নেতৃত্ব তাঁর অধীনে থাকা সত্ত্বেও তাঁর জীবনযাপনে বিন্দুমাত্র বিলাসিতা আসেনি। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.)-এর পরিবার কখনো পরপর দুদিন যবের রুটি পেট ভরে খেতে পারেনি’ (মুসলিম)। এই অভাবের মাঝেও তাঁর হৃদয়ে ছিল অফুরন্ত প্রশান্তি। কারণ তাঁর কাছে প্রকৃত সম্পদ ছিল আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস।
প্রশান্তিময় জীবনের জন্য করণীয় : সুন্দর ও সফল জীবন গড়তে হলে আমাদের কিছু গুণ অর্জন করতে হবে-
ধৈর্য ধারণ করা : ধৈর্য সফলতার প্রথম সোপান। অভাব-অনটন কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিচলিত না হয়ে আল্লাহ তায়ালার ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা মুমিনের কাজ। যে ব্যক্তি ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ তার অন্তরকে তৃপ্তি দিয়ে ভরে দেন।
দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি : দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও বিলাসিতা ক্ষণস্থায়ী। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এসবের মোহ ফিকে হয়ে যাবে। রাসুল (সা.) দুনিয়াকে তুলনা করেছেন মুসাফিরের বিশ্রামস্থলের সঙ্গে। এই উপলব্ধি মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে আখেরাতের চিন্তায় মশগুল রাখে।
লোভ ও হিংসা বর্জন : লোভ ও হিংসা মানুষের চরিত্র কলুষিত করে এবং অন্তরের প্রশান্তি কেড়ে নেয়। অন্যের সম্পদের প্রতি নজর না দিয়ে নিজের অর্জিত রিজিকে সন্তুষ্ট থাকাই হলো প্রকৃত ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য।
নিবিড় প্রার্থনা : নিরলস প্রচেষ্টার সঙ্গে আল্লাহর কাছে দোয়া করা অপরিহার্য। মানুষ তার সাধ্যমতো চেষ্টা করবে, কিন্তু ফলাফলের জন্য রবের দরবারে বিনম্রভাবে প্রার্থনা করবে। আমরা যদি ধৈর্য, কানাআত ও লোভমুক্ত জীবনের শিক্ষাগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে আমাদের জীবন আর অপূর্ণতার ভারে ন্যুব্জ হবে না। আমাদের প্রতিটি দিন হয়ে উঠবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক নতুন উপলক্ষ। প্রকৃত সুখ সম্পদের স্তূপে নয়, বরং তৃপ্ত হৃদয়ের ছোট একটি কোণে লুকিয়ে থাকে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা
সময়ের আলো/ প্রিন্ট/কেএইচও