তীব্র দাবদাহের মধ্যে চরম পানি সংকটের আশঙ্কায় থাকা পাকিস্তান এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করে ভারতকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, ১৯৬০ সালের ঐতিহাসিক ‘সিন্ধু নদ পানি চুক্তি’ (আইডব্লিউটি) রক্ষা করা না হলে কাগজে-কলমে থাকা সমস্ত বৈশ্বিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
গত ২০২৫ সালের এপ্রিলে জম্মু-কাশ্মীরের পাহালগামে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহতের ঘটনার পর, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া এই পানি বণ্টন চুক্তিটি স্থগিত করে ভারত।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরক্ষীয় অঞ্চলে ‘এল নিনো’ আবহাওয়ার কারণে চলতি বছরের গ্রীষ্মে পাকিস্তানে ভয়াবহ খরা ও পানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদে ‘সিন্ধু নদ জলচুক্তি: আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম চাবিকাঠি’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইশহাক দার ভারতের চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে বলেন, পানিকে কখনোই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তিনি বলেন, যে চুক্তিতে একতরফা স্থগিত বা বাতিলের কোনো বিধান নেই, সেখানে কোনো পক্ষই এককভাবে নিজের দায়বদ্ধতা থেকে সরে আসতে পারে না। চুক্তিটিকে কেবল পানি বণ্টন চুক্তি নয়, বরং আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। একই সাথে তিনি মনে করিয়ে দেন, পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চুক্তির বাইরে পাকিস্তানের বরাদ্দকৃত পানি ডাইভার্ট বা কমানোর যেকোনো চেষ্টাকে যুদ্ধের শামিল হিসেবে গণ্য করা হবে।
সেমিনারে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেন, সিন্ধু নদ নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না। পানিকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধে একটি নতুন আন্তর্জাতিক কনভেনশন তৈরির প্রস্তাব দিয়ে সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিন্ধু নদ কোনো চাপের জায়গা বা দরকষাকষির ঘুঁটি নয়। এটি পাকিস্তানের জীবনরেখা। আর এই জীবনরেখাকে ফাঁসির দড়িতে পরিণত করার যেকোনো চেষ্টা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা হবে।
পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী মুসাদ্দিক মালিক আরও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সিন্ধু নদ জলচুক্তিটি দুই পারমাণবিক শক্তির মধ্যে তিনটি যুদ্ধ দেখার পরও টিকে ছিল। এই চুক্তি যদি এখন না টিকে, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীতে কাগজে-কলমে থাকা কোনো বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনাই আর নিরাপদ থাকবে না। সেমিনারে পাকিস্তানের সিন্ধু নদ ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষের (আইআরএসএ) চেয়ারম্যান মেহের আলী শাহ অভিযোগ করেন, ভারত সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে চেনাব (চন্দ্রভাগা) নদীর পানি প্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে।
নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য না করা হলেও, ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ডে ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত জাতিসংঘের এক অনুষ্ঠানে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হরিশ পারভাথানেনি বলেন, বারবার উসকানি এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ব্যর্থতার কারণেই ভারত এই চুক্তি স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ও মদদ দেওয়া বন্ধে নির্ভরযোগ্য এবং অপরিবর্তনযোগ্য পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত সিন্ধু নদ জলচুক্তি স্থগিতই থাকবে বলে স্পষ্ট জানান তিনি।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’ এবং সীমান্ত সংঘাতের পর থেকে দুই দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্থবির রয়েছে। দীর্ঘ ৬৫ বছর ধরে টিকে থাকা এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি এখন দুই পারমাণবিক প্রতিবেশীর বৈরিতার জেরে সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
সময়ের আলো/কহু