বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু স্টেডিয়াম আছে যেগুলো শুধু একটি ভেন্যু নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকা তেমনই একটি নাম। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন এই মাঠেই দিয়াগো ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং কয়েক মিনিট পর ঐতিহাসিক ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল।
প্রায় চার দশক পর সেই একই আজতেকায় আবারও বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ খেলতে নামছে থ্রি লায়ন্স। তবে এবার প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা নয়, স্বাগতিক মেক্সিকো। ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলের বিশ্বাস, ৪০ বছর আগের সেই আক্ষেপের জবাব দেওয়ার সময় এবার এসেছে।
বাংলাদেশ সময় সোমবার সকাল ৬টায় শেষ ১৬ পর্বে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও মেক্সিকো। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে ইতিহাস, পরিবেশ, মানসিক দৃঢ়তা এবং কৌশলেরও পরীক্ষা। শেষ ৩২ পর্বে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ঘাম ঝরিয়ে জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড।
রক্ষণভাগের ভুলে পিছিয়ে পড়লেও শেষ ১৫ মিনিটে অধিনায়ক হ্যারি কেনের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় থমাস টুখেলের দল। পাঁচ গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও নিজেকে এগিয়ে রেখেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। তবে জয় পেলেও পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে প্রথম অন-টার্গেট শট নিতে ইংল্যান্ডের সময় লেগেছিল ৩০ মিনিট, বিশ্বকাপে যা তাদের সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা।
অন্যদিকে স্বাগতিক মেক্সিকো এখন আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। শেষ ৩২ পর্বে ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে দুর্দান্ত ছন্দেই শেষ ষোলোয় এসেছে এল ত্রি। জুলিয়ান কিনোনেস গোলের সূচনা করেন, পরে রাউল হিমেনেজ ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। এই জয়ের মাধ্যমে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেয়েছে মেক্সিকো।
এর আগে টানা আটটি নকআউট ম্যাচে হারের হতাশা ছিল তাদের সঙ্গী। আজতেকা স্টেডিয়াম মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি। বিশ্বকাপে এই মাঠে ১০টি ম্যাচ খেলেও একবারও হারেনি তারা। জিতেছে আটটি, ড্র করেছে দুটি। এবারের বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা, চেকিয়া ও ইকুয়েডরকে হারিয়ে ঘরের মাঠের দাপট বজায় রেখেছে তারা।
পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক দেখায় ইংল্যান্ডই এগিয়ে। দুদলের সবশেষ চারটি মুখোমুখি ম্যাচেই জয় পেয়েছে থ্রি লায়ন্স। সবশেষ দেখা হয়েছিল ২০১০ সালের প্রীতি ম্যাচে, যেখানে ৩-১ ব্যবধানে জিতেছিল ইংল্যান্ড। তবে বিশ্বকাপে দুদলের এটি প্রথম নকআউট লড়াই। তাই অতীতের রেকর্ডের চেয়ে বর্তমান ফর্মই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে ১৯৮৬ সালের স্মৃতি টেনে আনেন ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেল, ‘অবশ্যই আমি ম্যারাডোনার সেই ম্যাচের কথা মনে করি। এবার আমাদের প্রাপ্য আমরা ফিরে পাব। এটা কার্মা। কার্মা এবার আমাদের পক্ষেই থাকবে।’
তবে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতাও স্বীকার করেছেন জার্মান এই কোচ। তার মতে, ২ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় খেলা ইংল্যান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। বলের গতি, খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়বে। সে কারণেই ম্যাচের আগের দিন মেক্সিকো সিটিতে পৌঁছে যত দ্রুত সম্ভব পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ইংল্যান্ড। অন্যদিকে মেক্সিকো কোচ হ্যাভিয়ের আগিরে প্রতিপক্ষকে যথেষ্ট সম্মান দেখিয়েছেন। তবে তার বিশ্বাস, ঘরের মাঠের সমর্থন, পরিচিত আবহাওয়া এবং উচ্চতার সুবিধা কাজে লাগাতে পারলে ইংল্যান্ডকে চাপে রাখা সম্ভব।
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হ্যারি কেন। মাঝমাঠে জুড বেলিংহ্যাম ও ডেকলান রাইস, দুই প্রান্তে বুকায়ো সাকা কিংবা অ্যান্থনি গর্ডনের গতি মেক্সিকোর রক্ষণে চাপ তৈরি করতে পারে। যদিও শেষ ম্যাচে ক্র্যাম্পে ভুগেছিলেন রাইস, তবু তার খেলার সম্ভাবনাই বেশি। অন্যদিকে মেক্সিকোর আক্রমণের প্রাণ জুলিয়ান কিনোনেস ও রাউল হিমেনেজ। এবারের বিশ্বকাপে চারটি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন কিনোনেস।
আর একটি গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারলেই এক বিশ্বকাপে মেক্সিকোর হয়ে সর্বোচ্চ গোলে অবদানের নতুন রেকর্ড গড়বেন তিনি। মাঝমাঠে এডসন আলভারেজের নেতৃত্ব এবং ১৭ বছর বয়সি গিলবার্তো মোরার সৃজনশীলতাও হতে পারে ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেওয়ার বড় উপাদান।
কৌশলগতভাবে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের স্কোয়াডের গভীরতা ও বেঞ্চের মান। অন্যদিকে মেক্সিকোর শক্তি দ্রুত পাল্টা আক্রমণ, সংগঠিত রক্ষণ, স্বাগতিক সমর্থকদের উন্মাদনা এবং আজতেকার উচ্চতা। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ইংল্যান্ড ৪ নম্বরে, মেক্সিকোর অবস্থান ১০। ঘরের মাঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দল। কাগজে-কলমের হিসাব এই ম্যাচে খুব বেশি কাজে নাও লাগতে পারে। ৪০ বছর আগের স্মৃতি, টুখেলের ‘কার্মা’ তত্ত্ব, মেক্সিকোর অজেয় আজতেকা আর শেষ আটে উঠার স্বপ্ন। সব মিলিয়ে শেষ ১৬-এর অন্যতম সেরা লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব।
সময়ের আলো/এসএকে