রাত বদলায়, প্রতিপক্ষ বদলায়, স্টেডিয়াম বদলায়। কিন্তু বদলায় না একটি দৃশ্য- লিওনেল মেসির রেকর্ড। মাঠে নামলেই ইতিহাসের পুরোনো পাতা ছিঁড়ে সেখানে নিজের নাম যুক্ত করেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। নতুন রেকর্ডে পুরোনো ছবি মুছে দেন। বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ কেপভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের জয়ে একের পর এক রেকর্ড গড়ে আরও একবার নিজের কিংবদন্তিকে সমৃদ্ধ করলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
কেপভার্দের বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ২০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মেসি। প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে একই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার এমন নজির আর কারও নেই। কেপভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির ৩০তম। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনিই প্রথম খেলোয়াড়, যিনি ৩০ ম্যাচ খেলার কীর্তি গড়লেন। শুধু ম্যাচসংখ্যাই নয়, নকআউট পর্বেও তার প্রভাব ক্রমেই আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এখন পর্যন্ত মেসির সরাসরি গোলে অবদান ১২টি ৬ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট। এর মাধ্যমে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন পেলে ও কিলিয়ান এমবাপেকে, যাদের দুজনেরই অবদান ছিল ১১টি করে।
আরেকটি বিরল কীর্তিও গড়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বকাপের নকআউটে টানা পাঁচ ম্যাচে গোল করা ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় ফুটবলার তিনি। এর আগে এই কীর্তি ছিল কেবল হাঙ্গেরির গিওর্গি সারোসি এবং ব্রাজিলের ভাভার। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের সর্বশেষ ছয়টি নকআউট ম্যাচে মেসি সরাসরি ১০টি গোলে অবদান রেখেছেন, নিজে করেছেন ৬টি, করিয়েছেন আরও ৪টি।
বয়সও যেন মেসির কাছে কেবল একটি সংখ্যা। তরুণ বয়সে বিশ্বকাপে যেখানে গোলসংখ্যা ছিল ৬টি, সেখানে ৩৫ পেরোনোর পর তার গোলসংখ্যা এখন ১৪। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৩৫ বছরের বেশি বয়সি বাকি সব ফুটবলার মিলে গোল করেছেন মাত্র ২৫টি। এই ম্যাচে আরেকটি ব্যতিক্রমী রেকর্ডও গড়ে ওঠে। ৩৯ বছর বয়সি মেসি যখন ৪০ বছর বয়সি কেপভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার জালে বল পাঠান, তখন গোলদাতা ও গোলকিপারের সম্মিলিত বয়স দাঁড়ায় ৭৯ বছর ৬১ দিন, বিশ্বকাপ ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ।
চলতি বিশ্বকাপে আরেকটি বিশেষ কীর্তির মালিক হয়েছেন মেসি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে দুটি ভিন্ন আসরে (২০২২ ও ২০২৬) সাত বা তার বেশি গোল করার নজির গড়েছেন তিনি। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ২২টি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে খেলেছেন মেসি। এর মধ্যে ১৪টি দলের বিপক্ষেই গোল করেছেন তিনি, যা তার ধারাবাহিকতার আরেকটি উজ্জ্বল প্রমাণ।
রেকর্ডের খাতা এখানেই শেষ নয়। চলতি বিশ্বকাপে আর মাত্র একটি গোল করলেই ১৯৩০ বিশ্বকাপে গুইলারমো স্তাবিলের করা ৮ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করবেন মেসি। অর্থাৎ এক আসরে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায়ও উঠে আসবেন তিনি।
কেপভার্দের বিপক্ষে জয়টি আর্জেন্টিনাকে শেষ ষোলোয় তুলেছে। সামনে অপেক্ষা মিসরের বিপক্ষে কঠিন লড়াই। তবে প্রতিটি ম্যাচেই নতুন ইতিহাস লিখতে থাকা মেসিকে দেখে মনে হচ্ছে, তার বিশ্বকাপের গল্প এখনও শেষ হয়নি। বরং প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি গোলে আর প্রতিটি জয়ে তিনি ফুটবল ইতিহাসে যোগ করে চলেছেন নতুন নতুন অধ্যায়।
সময়ের আলো/এসএকে