মাদক ও অপরাধ যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। যেখনেই অপরাধ সেখানেই মাদক। প্রথাগত মাদকের পাশাপাশি নতুন নতুন সিনথেটিক মাদক যোগ হচ্ছে দেশের বাজারে। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মাদকের অপব্যবহার। মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) যেন ঢাল-তলোয়ারবিহীন নিধিরাম সরকার! তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার বিদ্যমান আইনি কাঠামো শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে আসে- অবিবাহিতদের তুলনায় বিবাহিতরা বেশি মাদক সেবন করেন। দেড় সহস্রাধিক মাদক সেবনকারীর ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায় প্রায় ৬৩ শতাংশই বিবাহিত এবং মাদকের টাকা জোগাড় করতে বাবার পকেটের টাকা চুরি করেন ২২ শতাংশ মাদকসেবী।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক সব অপরাধের মূলেই আছে মাদক। একজন মাদকাসক্ত তার নেশার জন্য ক্রমেই হিংস্র হয়ে ওঠে। তখন সে এমন কোনো কাজ নেই যা সে করে না। প্রথমে বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করে। পরে নিজ বাসা থেকে মা-বোনের অলংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী চুরি করে। পরিবারের অর্থ-সম্পদ চুরির পর পরিবার থেকেও একসময় বিতাড়িত হয়ে যায় সে। এরপর সে জড়িয়ে পড়ে বাইরের অপরাধ জগতে। নেশার টাকা জোগাতে ছিনতাই, চুরি করে কিংবা নিজেই জড়িয়ে পড়ে মাদকের ব্যবসায়। এভাবেই একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সন্ত্রাসী।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বেশ কয়েক বছর ধরে বেড়ে যাওয়া ধর্ষণ, কিশোর গ্যাং. চুরি, ছিনতাই, হত্যা কিংবা আত্মহত্যার ঘটনার পেছনেও আছে এই মাদক।
২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগ এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেডের (আরএমসিএল) সহযোগিতায় দেশব্যাপী মাদকের বিষয়ে বিস্তারিত জরিপ ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। যা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়।
ওই গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে মাদকসেবীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। মাদক গ্রহণের কারণ, মাদকের অর্থ সংগ্রহের উৎসসহ বিভিন্ন বিষয়। সেই সঙ্গে সুপারিশ করা হয় ভয়াবহ এই ‘মহামারি’ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায়।
মাদক সেবনকারীদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বাবা নেই, মা আছে। আর শুধু বাবার সঙ্গে থাকেন ২৪ শতাংশ মাদকসেবী। ৪১ শতাংশের বেশি বসবাস করেন মা-বাবার সঙ্গে পরিবারে অবস্থান করেন। স্ত্রী-সন্তান আছে এমন মাদকসেবী ৩৬ শতাংশের বেশি।
পারিবারিক মাসিক আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার এমন মাদকসেবী ৩০ শতাংশের বেশি। ২৬ শতাংশ মাদক গ্রহণকারীদের পারিবারিক মাসিক আয় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাদকসেবীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশের পারিবারিক মাসিক আয় ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে।
মাদক সেবনকারীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জানিয়েছেন বন্ধুদের হাত ধরে তারা মাদক গ্রহণ শুরু করেছেন। জরিপের ফলাফলে উঠে আসে মাদকসেবীদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই মাদক সেবন শুরু করেন বন্ধুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। আর কৌতূহলবসত মাদক শুরু করেন ৩৩ শতাংশ। মাদক সেবনকারীদের মধ্যে ৯৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৬ শতাংশ নারী।
১৫১২ জন মাদক সেবনকারীর উপপরিচালিত জরিপে উঠে আসে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ ও যুবক। যারা সংখ্যায় ৪৩ শতাংশ। এদের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। শতকরা ২৪ শতাংশ মাদক সেবনকারীর বয়স ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে।
মাদক সেবনকারীদের পেশাগত তথ্য বিশ্লেষণ জরিপে উঠে আসে ব্যবসায়ীদের চেয়ে চাকরিজীবীরা বেশি মাদক গ্রহণ করেন। মাদকসেবীদের ২৮ শতাংশ চাকরিজীবী এবং ২১ শতকরা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর মাদক সেবন করে বলে জরিপে উঠে আসে। মাদকসেবীদের ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। শিল্প শ্রমিক ৫ শতাংশ, কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত মাদকসেবী ৮ শতাংশ। এ ছাড়া পেশা জানা যায়নি এমন মাদকসেবী ২১ শতাংশ।
পরিবারের ওপর নির্ভরশীল এমন মাদকসেবীদের পিতার পেশা বিশ্লেষণে দেখা যায় ব্যবসায়ী সন্তানদের মধ্যে মাদক গ্রহণের হার বেশি। জরিপের ফলাফলে দেখা যায় মাদকসেবীদের মধ্যে ২৮ শতাংশের পিতা ব্যবসায়ী, ২৫ শতাংশ কৃষক এবং ২০ শতাংশের পিতা চাকরিজীবী। অন্য পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত ২২ শতাংশ।
৪৩ শতাংশ মাদক সেবন করেন আনন্দ করার জন্য আর প্রায় ৩৯ শতাংশ জানিয়েছেন তারা মজা কিংবা উপভোগ করার জন্য মাদক গ্রহণ করেন। অর্থাৎ আনন্দ ও মজা করার জন্যই ৮২ শতাংশ মাদক গ্রহণ করছেন। অন্যদিকে মানসিক শান্তি পেতে ২১ শতাংশ মাদক গ্রহণ করেন। ২০ শতাংশ মাদকসেবী জানিয়েছেন তারা সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে মাদক সেবন করেন।
একজন মাদকসেবী প্রতি মাসে মাদকের পেছনে গড়ে ব্যয় করেন ৪ হাজার টাকারও বেশি। তবে এই অর্থের পরিমাণ বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নারকোটিকসের জরিপ অনুযায়ী মাদকের পেছনে মাসে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা ব্যয় করেন প্রায় ৪৫ শতাংশ মাদকসেবী।
৪৮ শতাংশ মাদকসেবী জানিয়েছেন তারা নিজেরাই মাদক ব্যবসা করে মাদকের টাকা সংগ্রহ করেন। ৪৭ শতাংশ মাদকসেবী জানান তারা পরিবারের খরচ (বাজেট) থেকে এই টাকা ব্যয় করছেন। অর্থাৎ পরিবার সরাসরি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাদকাসক্তের কারণে। বাবার পকেটের টাকা চুরি করে মাদক সেবন করেন ২২ শতাংশ।
প্রথাগত মাদকের পাশাপাশি দেশের বাজারে নতুন সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের আবির্ভাবের ফলে সমস্যা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এলএসডি, এমডিএমবি এবং কেটামিনের মতো ভয়ংকর সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদক পাওয়া যাচ্ছে। প্রথাগত মাদকের পাশাপাশি ডার্ক ওয়েব ও কুরিয়ারের মাধ্যমে আসা নতুন প্রজন্মের এসব কৃত্রিম মাদক উচ্চবিত্ত ও তরুণদের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক ব্যবহার করছেন। যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। নতুন সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের আবির্ভাবের ফলে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারজনিত সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন ও আধুনিকায়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।
ডিএনসির বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ও তা দূরীকরণের সরকারি পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আমাদের কর্মকর্তাদের ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো খালি হাতে সশস্ত্র মাদক চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে অধিদফতরে অত্যাধুনিক অস্ত্র, পর্যাপ্ত ট্রান্সপোর্টেশন ও ডগ স্কোয়াড যুক্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া আসামিদের থানায় সোপর্দ করার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য আধুনিক হাজতখানা নির্মাণ করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তরুণ প্রজন্মের মাদকাসক্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম নতুন নতুন মাদক গ্রহন করাকে এখন তাদের লাইফস্টাইল হিসেবে মনে করে। কি মাদক কোথায় গ্রহণ করছে তার ওপর তাদের স্ট্যাটাস নির্ভর করে বলে মনে করছে তারা।
সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দেশেক মাদক মুক্ত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন। দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮২ লাখ নয় বরং দেড় থেকে দুই কোটি বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সময়ের আলো/এসএকে