ফুটবলে বুঁদ হয়ে আছে পুরো বিশ্ব। বিশ্বকাপের ৪৮ দলে নেই বাংলাদেশ। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও অবস্থান অনেক পেছনে। তবু বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল শেষ ষোলো নিশ্চিত হওয়ার আনন্দে যেন বাংলাদেশও টিকে আছে। মাঠে নয়, আবেগে।
দুই ফুটবল পরাশক্তির সমর্থনে বিভক্ত কোটি কোটি বাংলাদেশি এখন নিজেদের দলকে নিয়ে নতুন স্বপ্ন বুনছেন। চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের অলিগলি, শহর-বন্দর, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, গ্রামগঞ্জ রূপ নেয় আকাশি-সাদা কিংবা হলুদ-সবুজের রঙে। কোথাও বিশাল পতাকা, কোথাও বড় পর্দায় খেলা দেখা, আবার কোথাও রাতভর তর্ক-বিতর্ক কে হবে বিশ্বসেরা।
এবারের ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব থার্টি-টু শেষ হওয়ার পর সেই উন্মাদনা আরও বেড়েছে। ১৬টি দল নিশ্চিত করেছে শেষ ষোলো। আর সেই তালিকায় আছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, ইউরোপের শক্তিধর স্পেন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, পর্তুগাল, আফ্রিকার মরক্কো, উদীয়মান নরওয়ে, কলম্বিয়া, সুইজারল্যান্ড, মিসর, বেলজিয়াম, প্যারাগুয়ে, মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ আছে। ঢাকার টিএসসি থেকে রাজশাহীর পদ্মাপাড়, চট্টগ্রামের টাইগারপাস থেকে বরিশালের গ্রাম- সব জায়গাতেই চলছে উৎসব। একটি পরিবারের বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক, মা ব্রাজিলের। দুই ভাই দুই শিবিরে। অফিসে বাজি, বিশ্ববিদ্যালয়ে তর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠাট্টা বিশ্বকাপ যেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব। এই উন্মাদনার শিকড় অনেক গভীরে।
এর আগে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই ব্রাজিল সমর্থন করতেন। কিন্তু ১৯৮৬ সালের পর থেকে এ দেশে আর্জেন্টিনার বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হতে শুরু করে। ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ জয় বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে আর্জেন্টিনার বীজ বপন করে। এর চার বছর পর অর্থাৎ ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ার পর এই ভালোবাসার বন্ধন আরও মজবুত হয়েছিল। ১৯৯০ সালের ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর ম্যারাডোনা যখন ট্রফি ছুঁতে পারলেন না এবং কান্নায় ভেঙে পড়লেন, সেই দৃশ্য এ দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। মূলত তখন থেকেই বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থন স্থায়ী রূপ নেয়। কিন্তু জার্মানি বা ইতালির মতো ফুটবল পরাশক্তিগুলো কখনোই এ দেশে তেমন বড় সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করতে পারেনি। এ দেশের মানুষের আবেগের জায়গা ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা পুরোপুরি দখল করে নেয়।
পেলে, জিকো, রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকার ধারাবাহিক সাফল্যে আগে থেকেই শক্ত অবস্থানে ছিল ব্রাজিল। পরবর্তী সময়ে লিওনেল মেসি ও নেইমারের আবির্ভাব সেই বিভাজনকে আরও গভীর করেছে। আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া বিতর্ক মেসি নাকি ব্রাজিল।
ফুটবল হয়ে উঠেছে কূটনীতির ভাষাও। বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস বলেছেন, ব্রাজিলের মানুষের কাছে ফুটবল শুধু খেলা নয়; এটি আনন্দ, শান্তি ও সম্প্রীতির প্রতীক। প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা বলেছেন, ফুটবল বিভিন্ন দেশের মানুষকে একত্র করে। বাংলাদেশ, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশিদের অভূতপূর্ব সমর্থনের পরই ৪৫ বছর পর ঢাকায় পুনরায় দূতাবাস চালু করে আর্জেন্টিনা। ফুটবল যে কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে, তার বিরল উদাহরণ এটি।
কেপ ভার্দের কাছে কেঁপে উঠেও টিকে রইল আর্জেন্টিনা। স্কোরলাইন ৩-২। কিন্তু ম্যাচের গল্প বলছে অন্য কথা। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত জিতেছে ঠিকই, তবে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দে তাদের ১২০ মিনিট তটস্থ করে রেখেছিল। ২৯ মিনিটে লিওনেল মেসির দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। এটি চলতি বিশ্বকাপে তার সপ্তম এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ২০তম গোল। একই সঙ্গে টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন অধিনায়ক। বিরতির পর ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় কেপ ভার্দে। ৫৯ মিনিটে দেরয় দুয়ার্তে সমতা ফেরান। নির্ধারিত সময় ১-১ সমতায় শেষ হলে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ৯২ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেস আবারও এগিয়ে দেন আর্জেন্টিনাকে।
কিন্তু ১০৩ মিনিটে সিডনি কাবরালের দুর্দান্ত বাঁকানো শট আবারও সমতায় ফেরায় আফ্রিকার দলটিকে। ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকেই এগোচ্ছিল, তখন ১১১ মিনিটে আসে ভাগ্যনির্ধারক মুহূর্ত। মেসির কর্নার থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড কেপ ভার্দের বোর্হেসের হাতে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে যায়। আত্মঘাতী সেই গোলেই ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। তবু ম্যাচের প্রকৃত নায়ক হয়ে থাকল কেপ ভার্দে। গোলরক্ষক ভোজিনিয়া একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে মেসি-আলভারেজদের হতাশ করেছেন। শেষ মুহূর্তে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের দুটি দুর্দান্ত সেভ না থাকলে হয়তো বিদায়ই নিতে হতো বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের। আগামী ৭ জুলাই শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ মিসর।
ব্রাজিলের সামনে ইতিহাসের পরীক্ষা। টুর্নামেন্টের শুরুতে মরক্কোর সঙ্গে ড্র করলেও এরপর টানা তিন জয় তুলে নিয়েছে ব্রাজিল। শেষ ৩২-এ জাপানকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে সেলেসাওরা। এবার তাদের সামনে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে। কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। চারবার মুখোমুখি হয়ে ব্রাজিল একবারও নরওয়েকে হারাতে পারেনি। দুটি ম্যাচে নরওয়ের জয়, দুটি ড্র। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে রোনালদো-রিভালদোদের হারিয়ে দেওয়া সেই স্মৃতি এখনও ফুটবলপ্রেমীদের মনে আছে।
ফলে এবারও হালান্ডদের হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ব্রাজিল জিতলে কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ হবে ইংল্যান্ড অথবা স্বাগতিক মেক্সিকো। ইংল্যান্ড এখন পর্যন্ত অপরাজিত। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও শেষ দিকে দুই গোল করে জিতেছে তারা। চার ম্যাচে হ্যারি কেইনের গোল পাঁচটি। অন্যদিকে মেক্সিকো এখনও একটি গোলও হজম করেনি। স্বাগতিকদের সংগঠিত রক্ষণ ব্রাজিলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
শেষ ষোলোর সবচেয়ে বড় লড়াই পর্তুগাল বনাম স্পেন ম্যাচটি ঘিরে তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা। একদিকে অভিজ্ঞ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের প্রতীক লামিন ইয়ামাল। অনেকে এই ম্যাচকে দুই প্রজন্মের লড়াই বলছেন। যে দল জিতবে, তারা কোয়ার্টার ফাইনালে অন্যতম ফেবারিট হয়ে উঠবে।
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের মানুষ অন্য দেশের জয়ে আনন্দে ভাসে। কিন্তু নিজেদের জাতীয় দলকে নিয়ে এমন উল্লাস করার সুযোগ এখনও আসেনি। ফুটবলে একদিন সেই স্বপ্ন পূরণ হবে। আমাদের আকাশে পতপত করে উড়বে শুধু একটি লাল সবুজের পতাকা। বাংলাদেশের পতাকা।
সময়ের আলো/এসএকে