গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বিরোধপূর্ণ জমির সমাধানকল্পে আয়োজিত এক সালিশ বৈঠকে মারামারির ঘটনায় মো. আব্দুর রাজ্জাক মিয়া (৪৫) নামের এক জাতীয় পার্টি (জাপা) নেতার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় দুই নারীসহ একই পরিবারের পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ।
রোববার (৫ জুলাই) বিকেলে উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের চাচিয়া মীরগঞ্জ গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহত আব্দুর রাজ্জাক ওই গ্রামের মৃত খাইরুজ্জামানের ছেলে এবং স্থানীয় ওয়ার্ড জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
ঘটনার পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে একই গ্রামের পাঁচজনকে আটক করেছে। তারা হলেন, মো. গোলজার হোসেন (৬৫), তার স্ত্রী মোছা. মঞ্জোয়ারা বেগম (৪৫), তাদের দুই ছেলে মো. লিটন মিয়া (২৮), ছোট ছেলে, মো. রিপন মিয়া (১৯), মেয়ে মোছা. রত্না আক্তার (৩০)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চাচিয়া মীরগঞ্জ গ্রামের মৃত আছর উদ্দিন জীবদ্দশায় দুটি বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রীর কোনো সন্তান না থাকায় তিনি গোলেনুর বেগম নামের এক নারীকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। গোলেনুর বেগমের আগের পক্ষের সন্তান ছিলেন গোলজার রহমান। পারিবারিক সিদ্ধান্তে আছর উদ্দিন জীবদ্দশায় গোলজারকে ২২ শতক জমি লিখে দেন। পরবর্তী সময়ে আছর ও গোলেনুর দম্পতির সংসারে আমজাদ হোসেন নামের এক ছেলের জন্ম হয়। এই ২২ শতক জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমজাদ ও গোলজারের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে পূর্বে একাধিকবার সালিশ হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
পূর্ববিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে রোববার বিকেলে আবারও এক সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করছিলেন তারাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম লেবু। উপস্থিত ছিলেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. বাবুল আহমেদসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
নিহত জাপা নেতা আব্দুর রাজ্জাক মিয়া ওই বৈঠকে যোগ দিতে আসা মাত্রই সবার উপস্থিতিতে গোলজার হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যরা আকস্মিক তার ওপর হামলা চালান। মারধরে গুরুতর আহত অবস্থায় রাজ্জাককে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত আব্দুর রাজ্জাকের মা মোছা. রোসনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওই মিটিংয়ে চেয়ারম্যান ও বিএনপির বাবুলও ছিলেন। তাদের সামনেই আমার ছেলেটাকে মারধর করা হয়েছে। তারা কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।
সালিশের আয়োজন করা উঠানের মালিক মো. আবুল কালাম আজাদও বৈঠকে চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতার উপস্থিত থাকার কথা নিশ্চিত করেছেন।
তবে ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।
ইউপি চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম লেবু বলেন, আমি বৈঠকের সভাপতিত্ব করছিলাম এবং সেখানে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাবুল আহমেদও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সালিশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই মারামারি বেঁধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বৈঠক বাতিল করে আমরা চলে আসি।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. বাবুল আহমেদ দাবি করেন, আমার ওই সালিশ বৈঠকে যাওয়ার কথা ছিল ঠিকই, কিন্তু ঘটনার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। পথিমধ্যে একজনের মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি আর ঘটনাস্থলে যাইনি এবং বৈঠক বাতিল করা হয়।
এদিকে তারাপুর ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম মাস্টার জানান, নিহত আব্দুর রাজ্জাক মৌখিকভাবে ওই ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন, তবে কাগজ-কলমে কমিটি এখনো পূর্ণাঙ্গ করা হয়নি।
সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ জানান, সালিশ বৈঠকে মারধরের ঘটনায় একজন মারা গেছেন। এ প্রেক্ষিতে দুই নারীসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হচ্ছে। এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলেই নিয়মিত মামলাসহ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে।
সময়ের আলো/জোই