নিউ জার্সির সবুজ গালিচায় তখন কেবলই হলুদ-নীল কান্নার রোল। রেফারি শেষ বাঁশিটা বাজাতেই পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের ফুটবলাররা যেন মাঠেই ভেঙে পড়লেন। ১-২ গোলের ব্যবধানে নরওয়ের কাছে হেরে ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ছোঁয়ার আগেই বিদায় নিতে হলো সেলেসাওদের। ওদিকে নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের মুখে তখন চওড়া হাসি-তারই জোড়া গোলে ভর করে ইতিহাস গড়ে শেষ আটে পা রাখল নরওয়ে। কিন্তু এই হারের গল্পটা কি কেবলই নরওয়ের দুর্দান্ত ফুটবল বা হালান্ডের অতিমানবীয় ফর্মের? ম্যাচের খেরোখাতা উল্টালে দেখা যাবে, ব্রাজিল আসলে হেরেছে তাদের নিজেদের করা ভুলের চড়া মাশুল দিয়ে।
জেনে নেওয়া যাক ব্রাজিলের সেই ট্র্যাজেডির নেপথ্য কাহিনী :
১. অচেনা ব্রাজিল ও রক্ষণাত্মক খোলস
ব্রাজিল মানেই তো সাম্বা ফুটবল, আক্রমণ আর জোগো বোনিতো! কিন্তু নিউ জার্সির মাঠে এদিন দেখা গেল এক উল্টো ছবি। কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে যে সাহসী, আক্রমণাত্মক ব্রাজিলের গল্প শোনার অপেক্ষায় ছিল ভক্তরা, মাঠে তার বিন্দুমাত্র দেখা মিলল না। শুরু থেকেই ব্রাজিল যেন এক অদ্ভুত রক্ষণাত্মক খোলসে ঢুকে গেল। বলের দখল নরওয়ের পায়ে ছেড়ে দিয়ে তারা অপেক্ষা করতে লাগল পাল্টা আক্রমণের। এই অতি-রক্ষণাত্মক মানসিকতাই কাল হলো; নরওয়েকে চেপে ধরার বদলে ব্রাজিল নিজেই সারাক্ষণ কোণঠাসা হয়ে রইল।
২. পেনাল্টির ট্র্যাজেডি ও ব্রুনোর রান-আপ
ম্যাচের প্রথমার্ধেই ভাগ্য ব্রাজিলের দিকে একটুখানি হেসেছিল। পেনাল্টি পেয়েছিল দল। স্পট-কিক নিতে এগিয়ে এলেন ব্রুনো গিমারেস। কিন্তু গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করতে গিয়ে এক অদ্ভুত ‘স্টাটার-স্টেপ’ (থেমে থেমে দৌড়ানো) রান-আপ নিলেন তিনি। লাভ তো হলোই না, উল্টো নরওয়ের গোলরক্ষক ইয়োরিয়ান নাইল্যান্ড সহজেই তার শট রুখে দিলেন। ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম কোনো ব্রাজিলিয়ান বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিস করার তেতো স্বাদ পেলেন। চাপের মুখে ভেঙে পড়ার সেই পুরোনো রোগটাই যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
৩. ধারহীন তারুণ্য ও ফিনিশিংয়ের অভাব
নেইমারকে যখন শুরুতে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হলো, তখন ভরসা ছিল তরুণ তুর্কিদের ওপর। কিন্তু ভিনিসিয়ুস জুনিয়র মাঝেমধ্যে গতির ঝলক দেখালেও শেষ মুহূর্তে কী করবেন, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলেন। আর বদলি হিসেবে মাঠে নামা তরুণ বিস্ময় এনদ্রিক? ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার মতো একটা সহজ সুযোগ পেয়েও বল মারলেন পোস্টের বাইরে! তরুণ আক্রমণের এই ধারহীনতাই শেষ পর্যন্ত সেলেসাওদের ভুগিয়েছে।
৪. হালান্ড নামক এক মুক্ত দানব
নরওয়েকে হারাতে হলে প্রথম শর্তই ছিল আর্লিং হালান্ডকে বোতলবন্দি করে রাখা। কিন্তু ব্রাজিলের রক্ষণভাগ যেন সেই খাতা কলমেই আনেনি! পুরো ম্যাচে বিশ্বের অন্যতম সেরা এই স্ট্রাইকারকে রীতিমতো ‘মুক্ত’ ছেড়ে দেওয়া হলো। একবার সম্পূর্ণ ফাঁকায় দাঁড়িয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ালেন, আরেকবার ব্রাজিলের ডিফেন্ডারদের মাথার ওপর দিয়ে বুলেট গতিতে করলেন জোরালো হেড। দু-দুটি গোলই এলো হালান্ডের পা আর মাথা থেকে। এমন একজন গোলমেশিনকে বক্সে একা ছেড়ে দেওয়া তো রক্ষণের আত্মহত্যারই শামিল!
৫. মাঝমাঠের লাগামহীন ব্যর্থতা
পুরো ম্যাচে বলের দখল মাত্র ৩৭% ছিল ব্রাজিলের পায়ে! ভাবা যায়? কাসেমিরো আর ব্রুনো গিমারেসের মতো অভিজ্ঞদের নিয়ে গড়া মাঝমাঠ ম্যাচটার নিয়ন্ত্রণই নিতে পারেনি। মাঝমাঠের এই লাগামহীন পারফরম্যান্সের কারণে আক্রমণভাগ কোনো বল পাচ্ছিল না, আবার রক্ষণভাগও প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমণের ঢেউ সামলাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। পুরো খেলাটাই নিয়ন্ত্রণ করেছে নরওয়ে।
৬. আনচেলত্তির সিদ্ধান্ত ও নেইমারের দেরিতে আগমন
যখন নাম্বার টেন রোলে থাকা লুকাস পাকেতা ইনজুরিতে ছিটকে গেলেন, তখন মাঠের নেতা হিসেবে নেইমারেরই তো সবার আগে মাঠে থাকার কথা ছিল। কিন্তু কোচ আনচেলত্তি কেন যেন নেইমারকে বেঞ্চেই বসিয়ে রাখলেন। শেষ দিকে যখন নেইমার মাঠে নামলেন, তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। ম্যাচের একদম অন্তিম মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে গোল করে তিনি ব্যবধান (১-২) কমালেন ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে ব্রাজিলের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। ভক্তদের মনে তাই আক্ষেপ রয়েই গেল-নেইমার যদি শুরু থেকে থাকতেন, তবে হয়তো প্রথমার্ধের পেনাল্টিটা মিস হতো না, স্কোরলাইনটাও অন্যরকম হতে পারত!
সময়ের আলো/আরবিএন