কিছু বিদায় স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না, লেখা থাকে অশ্রুতে। কিছু পরাজয় শুধু একটি ম্যাচ হারার গল্প নয়, একটি যুগের অবসানের গল্পও। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজতেই হাঁটু গেড়ে বসা নেইমার জুনিয়রের গল্পটা ঠিক তেমনই। ১৬ বছর আগে যে মেটলাইফে রাজসিক শুরু, সেখানেই আক্ষেপের বিদায়ি তুলিতে শেষ আঁচড় কাটলেন।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে হেরে ফুটবলকে বিদায় বললেন ব্রাজিলের অন্যতম সেরা তারকা নেইমার। নরওয়ের বিপক্ষে হারের পর মুখ ঢেকে নেইমারের কান্না, সতীর্থদের সান্ত্বনা আর গ্যালারিতে নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া হাজারো ব্রাজিল সমর্থক- মুহূর্তেই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল সাম্বা ফুটবলের এক বর্ণিল অধ্যায়ের পর্দা নেমে গেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। সেই পরাজয়ের পর আবেগঘন কণ্ঠে জাতীয় দলের জার্সিকে বিদায় জানান ৩৪ বছর বয়সি নেইমার।
ম্যাচ শেষে চোখের জল সামলাতে না পেরে তিনি বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি। আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল এখানেই, মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। আর শেষও হলো এখানেই। এখন সব শেষ।’ এ যেন ভাগ্যেরই এক নির্মম বৃত্ত। ২০১০ সালের ১০ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। প্রায় ১৬ বছর পর একই মাঠে শেষ হলো তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
চোটের কারণে এবারের বিশ্বকাপে শুরু থেকেই নিয়মিত ছিলেন না তিনি। ডান পায়ের কাফের সমস্যায় গ্রুপ পর্বের বেশিরভাগ সময় মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ দিকে কিছু সময় খেললেও নরওয়ের বিপক্ষে শুরুতে ছিলেন বেঞ্চে। ৬৭ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করেন। কিন্তু সেই গোল শুধু ব্যবধান কমিয়েছে, বিশ্বকাপে ব্রাজিলের যাত্রা আর দীর্ঘ করতে পারেনি।
বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে চারটি আসরে খেলেছেন নেইমার ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো বাধা এসে থামিয়েছে তাকে। ২০১৪ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ভয়াবহ চোট, ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে বিদায়, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারের হতাশা, আর এবার শেষ ষোলোতেই নরওয়ের কাছে পরাজয়।
এই বিদায়ের সঙ্গে নেইমারের নামের পাশে যোগ হয়েছে এক বিরল পরিসংখ্যানও। ব্রাজিলের ইতিহাসে তিনি মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার, যিনি চারটি বিশ্বকাপে খেলে একবারও শিরোপা জিততে পারেননি। এর আগে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন সাবেক অধিনায়ক থিয়াগো সিলভা।
তবে অপূর্ণতার মাঝেও রয়েছে গৌরব। ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েছেন নেইমার। জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও তার দখলে। ২০২৩ সালে তিনি পেলের গোলসংখ্যা ছাড়িয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছিলেন।
তবু নেইমারের ক্যারিয়ারকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন ব্রাজিলের ফুটবল স্বপ্নের প্রতীক। তার পায়ের জাদু, ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা, সাহসী আক্রমণ আর প্রতিপক্ষকে মুহূর্তে পরাস্ত করার ক্ষমতা কোটি ফুটবলপ্রেমীকে মুগ্ধ করেছে।
বিশ্বকাপ ট্রফি হয়তো তার হাতে উঠেনি নেইমারের। কিন্তু সব কিংবদন্তির পরিচয় ট্রফিতে নয়, রেখে যাওয়া স্মৃতিতে। নেইমারও সেই বিরল ফুটবলারদের একজন, যার নাম উচ্চারিত হবে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের শিল্প, সৌন্দর্য ও আবেগের প্রতীক হিসেবে।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই কান্নাভেজা রাত তাই শুধু একটি পরাজয়ের নয়; একটি স্বপ্নের, একটি প্রজন্মের এবং ব্রাজিলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের শেষ আলোকরেখা হয়ে ইতিহাসে থেকে যাবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি