বিশ্বকাপ আসলে কী? অনেকের চোখেই এটি এক ‘স্বপ্নলোক’। তবে ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ শুধু স্বপ্নের আসরই নয়, এটি ভীষণ নিষ্ঠুরও। চার বছর পরপর আসা এই আসর কাউকে করে দেয় রাজা, আবার কাউকে অনেক আশা জাগিয়েও করে দেয় নিঃস্ব। কারও জন্য এটি নায়ক থেকে মহানায়ক হওয়ার মঞ্চ, আবার কারও কাছে শেষ পর্যন্ত থেকে যায় শুধুই এক অতৃপ্তি আর না পাওয়ার বেদনা নিয়ে দেশে ফেরার আসর।
ইয়োহান ক্রুয়েফ, জিকো, সক্রেটিস, মিশেল প্লাতিনি কিংবা পুসকাসের মতো কত বড় বড় ফুটবলারের ভাগ্যেই তো ধরা দেয়নি এই সোনালি ট্রফি। সেই না পাওয়ার বেদনাবিধুর তালিকায় এবার সর্বশেষ সংযোজন হলেন ব্রাজিলের বর্তমান পোস্টার বয় নেইমার।
অথচ ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে কারও যে কৃতিত্ব নেই— পেলে, জিকো, রোমারিও আর রোনালদোর মতো কিংবদন্তিরাও যা করে দেখাতে পারেননি, সেই অনন্য রেকর্ডটি রয়েছে নেইমারের ঝুলিতে। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সি গায়ে সবচেয়ে বেশি ৮০টি গোল করার রেকর্ডটি শুধু তারই।
ফুটবল মহারাজ পেলের করা ৭৭ গোলের রেকর্ড ভেঙে ১৩০ ম্যাচে দেশের হয়ে সর্বাধিক গোলের এই কীর্তি গড়েন তিনি। একজন দক্ষ ফুটবলার, মাস্টার ড্রিবলার ও প্লে-মেকার হিসেবে নেইমার বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। মেসি ও রোনালদোর মতো ব্যালন ডি’অর বা ফিফার বর্ষসেরার খেতাব না জিতলেও, বেশ কয়েকবার সংক্ষিপ্ত তালিকায় সেরা দু-তিনে ছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান অলটাইম গ্রেট। ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপ এবং ২০১৬ সালে অলিম্পিকে ব্রাজিলের প্রথম স্বর্ণপদক জয়ের অন্যতম স্থপতিও ছিলেন তিনি।
কিন্তু হায়! গত এক যুগে ব্রাজিলীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হয়েও নেইমারকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে শূন্য হাতে। পেলে, রোমারিও, রোনালদিনহো কিংবা কাকাদের মতো তার হাতে ওঠেনি সোনালি ট্রফি। চার চারবার (২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) বিশ্বকাপ খেলেও ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে না পারার আক্ষেপ আর হতাশা নিয়ে গত ৫ জুলাই আমেরিকার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ হলো নেইমারের বিশ্বকাপ অভিযাত্রা।
বিশ্বকাপে চারবার অংশ নিয়ে ১৫ ম্যাচে ৯ গোল করা এবং দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবার চেয়ে বেশি গোল করা এই তারকাকে মাঠ ছাড়তে হলো খালি হাতে, ঠিক যেমনটি একসময় ফিরেছিলেন তাঁর দুই পূর্বসূরি জিকো এবং সক্রেটিস। ১৯৮২ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ফর্মের তুঙ্গে থাকা জিকো-সক্রেটিসকেও সম্ভাব্য সেরা পারফরমার ধরা হলেও, তাঁরাও সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারেননি।
সবশেষ ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে আহামরি কিছু না খেলেও দুটি চমৎকার সুযোগসন্ধানী গোল দিয়ে ব্রাজিলকে কাঁদিয়েছেন আরলিং হালান্ড। হালান্ডের নরওয়েকে সেরা আটে পৌঁছে দিয়ে যখন পাদপ্রদীপের আলোয়, তখন ব্রাজিলের জার্সি গায়ে এত গোল করার কৃতিত্বের পরও নেইমার এখন শুধুই এক ‘ট্র্যাজেডি কিং’।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সারা ফুটবল বিশ্ব দাপিয়ে বেড়ানো নেইমারের আর ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে সোনার ছেলে হয়ে থাকা হলো না। মেধা, প্রতিভা, ফুটবল স্কিল, ড্রিবল করার ক্ষমতা আর সৃষ্টিশীলতায় লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর খুব কাছাকাছি থেকেও তার আর মহাতারকা হওয়া হলো না।
নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের হারের পর কান্নাভেজা নেইমারের মুখাবয়ব যেন ফুটবল বিশ্বকে অব্যক্ত স্বরে বলে দিল, ‘আমি পারলাম না। দলকে বিশ্বকাপ জেতানো সম্ভব হলো না। আমি নিজেও মহানায়ক হতে পারলাম না।’
সময়ের আলো/জেডি