ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শাখা ছাত্রশক্তির নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। কমিটির শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে এই কমিটি প্রত্যাহারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস কর্নারে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ছাত্রশক্তি বিতর্কিত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে এনে ছাত্রলীগকে পরোক্ষভাবে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সদস্য-সচিব মুবাশ্বির আমিন, যুগ্ম-আহ্বায়ক মিশনু আল আসনাউন এবং সদস্য নীরব আলীসহ অন্য কর্মীরা।
জানা গেছে, গত রোববার কেন্দ্রীয় ছাত্রশক্তি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ৩ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে। এতে বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফুয়াদ হাসানকে আহ্বায়ক এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইফতেহার উদ্দিনকে সদস্য সচিব করা হয়। আগামী এক বছরের জন্য এই কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করেন, আহ্বায়ক ফুয়াদ হাসান ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। বিভিন্ন মিছিল, সভা-সমাবেশ ও দলীয় কর্মসূচিতে তার নিয়মিত অংশগ্রহণের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও ছবি রয়েছে। ৫ আগস্টের পর তিনি হলগুলোতে ছাত্রলীগকে পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র করলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে হল ছাড়তে বাধ্য হন।
অন্যদিকে, সদস্য সচিব ইফতেহার উদ্দিনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ‘বহুরূপী’ আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। আন্দোলনের আগে তিনি ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ৫ আগস্টের পর কর্মী সংকটের সুযোগ নিয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। এছাড়া সাজিদ আবদুল্লাহ হত্যার বিচার দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ছাত্রলীগের চিহ্নিত কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চক্রান্তের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শুধু তাই নয়, ইফতেহারের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হলে অবস্থানরত বিদেশি শিক্ষার্থীদের হুমকি ও অসদাচরণ এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা প্রশ্ন তোলেন, এই কমিটি কি ছাত্রদলের বি-টিম, নাকি ছাত্রলীগের পুনর্বাসন কেন্দ্র? এই পকেট ও হাইব্রিড কমিটির ব্যানারে আবারও ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগকে পুনর্বাসনের নীলনকশা চলছে। আমরা এই বিতর্কিত কমিটি প্রত্যাখ্যান করছি এবং দ্রুত একটি পরিচ্ছন্ন কমিটি গঠনের দাবি জানাচ্ছি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রশক্তির ইবি শাখার আহ্বায়ক ফুয়াদ হাসান বলেন, হলে থাকার কারণে তৎকালীন সময়ে আমাদের বাধ্যতামূলকভাবে কিছু রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে যেতে হয়েছিল। তবে আমি কখনোই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলাম না। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে আমি সম্মুখসারিতে ছিলাম এবং এই কারণে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতারা আমাকে হল থেকেও বের করে দিয়েছিল।
সদস্য সচিব ইফতেহার উদ্দিন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি শাখা ছাত্রদলের কোনো পদের জন্য কখনো জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) দিইনি, কেউ তা প্রমাণও করতে পারবে না। হলের গণরুমে প্রায় ১০ মাস থাকার কারণে বাধ্য হয়ে কিছু মিছিলে যেতে হয়েছিল। তবে জুলাই আন্দোলনে আমি সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিলাম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার বলেন, আমাদের সংগঠনের নীতিমালা অনুযায়ী, অতীতে কেউ যে সংগঠনই করে থাকুক না কেন, যদি সে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকে এবং তার বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ না থাকে, তবে তাকে সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করতে আমাদের নীতিগত বাধা নেই। তবে কেউ যদি বর্তমানে অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় কর্মী হন কিংবা তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই