সিলেটকে বলা হয় ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলাম প্রচার, আধ্যাত্মিক চর্চা ও ধর্মীয় সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই জনপদ আজও সেই ঐতিহ্য বহন করছে হাজারো মসজিদের মাধ্যমে। কেবল আধ্যাত্মিক গুরুত্বেই নয়, মসজিদের সংখ্যার বিচারেও দেশের অন্যতম শীর্ষ অঞ্চলের নাম সিলেট বিভাগ।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সমন্বয় বিভাগের ৬ জুলাই প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে বর্তমানে মসজিদের সংখ্যা ২২ হাজার ৬টি। সারাদেশে মোট ৩ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি মসজিদের মধ্যে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে ৭১ হাজার ৫৯৬টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৩ হাজার ৭০৩টি মসজিদ থাকলেও ইতিহাস, স্থাপত্য ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের বিচারে সিলেটের অবস্থান স্বতন্ত্র।
সিলেটের চার জেলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য প্রাচীন মসজিদ সুলতানি, মোগল ও ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাস বহন করছে। কোথাও রয়েছে শাহজালাল (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন, কোথাও শত শত বছরের পুরোনো শিলালিপি, আবার কোথাও ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলীর অনন্য দৃষ্টান্ত।
সিলেট নগরীর হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে অবস্থিত দরগাহ মসজিদ সিলেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটি। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, শাহজালাল (রহ.) ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটে আগমনের পর এই টিলায় অবস্থান নেন এবং মৃত্যুর পর এখানেই সমাহিত হন।
ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, দরগাহ এলাকার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদের শিলালিপিতে সুলতান ইউসুফ শাহের শাসনামলে (১৪৭৪-১৪৮১) নির্মাণের উল্লেখ ছিল। পরবর্তীতে সেই স্থাপনা বিলুপ্ত হলেও ১৬৭৭ সালে মোগল ফৌজদার ফরহাদ খান বিখ্যাত ‘বড় গম্বুজ’ নির্মাণ করেন। বর্তমানে যে দরগাহ মসজিদটি রয়েছে, সেটি ১৭৪৪ সালে ফৌজদার বাহরাম খান নির্মাণ করেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জন ওয়ালিস এর সংস্কার করেন।
দরগাহ এলাকা থেকে অল্প দূরেই টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ। সপ্তদশ শতকে ফৌজদার ফরহাদ খাঁ নির্মিত ১৫ গম্বুজ ও ২২টি সিঁড়িবিশিষ্ট এই ঈদগাহ সিলেট বিভাগের বৃহত্তম ঈদগাহ হিসেবে পরিচিত।
সিলেট নগরীর আখালিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন আখালিয়া নবাবী মসজিদ, যা সুলতানী আমলের স্থাপত্যশৈলীর স্বাক্ষ্য বহন করছে। এছাড়া শাহপরান (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন প্রাচীন মসজিদ এবং জেলখানার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট শাহ আবু তোরাব মসজিদও জেলার উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা।
ওসমানীনগরের উছমানপুর জামে মসজিদ, যা ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে পরিচিত, স্থানীয় লোককথার জন্য বিশেষভাবে আলোচিত। জনশ্রুতি রয়েছে, শাহজালাল (রহ.)-এর তিন সফরসঙ্গী উছমান বোগদাদী, সৈয়দ মাহবুব খন্দকার ও সৈয়দ তাহির খন্দকার মসজিদটি আবিষ্কার করেছিলেন। প্রকৃত নির্মাতা সম্পর্কে আজও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
জকিগঞ্জ উপজেলার বারঠাকুরী ইউনিয়নের গায়েবী দিঘি মসজিদ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের নথিভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এখান থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো পাথরের শিলালিপি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলার কালাইউরা গ্রামের ‘ডিমের মসজিদ’ সিলেটের অন্যতম ব্যতিক্রমী স্থাপনা। পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম সচল মসজিদগুলোর একটি বলে পরিচিত এই মসজিদে একসঙ্গে মাত্র আটজন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার উচাইল গ্রামের শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদ, যা ‘লাল টিলা মসজিদ’ নামেও পরিচিত, শাহজালাল (রহ.)-এর সহযোদ্ধা শাহ মজলিশ আমিন (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। পরবর্তীতে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে ১৫১৩ সালে এর বর্তমান কাঠামো নির্মিত হয়। চারটি গম্বুজ, কারুকার্যমণ্ডিত স্তম্ভ এবং বিশাল দিঘিসহ মসজিদটি বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণাধীন।
সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাগলা এলাকার মহাসিং নদীর তীরে অবস্থিত পাগলা বড় জামে মসজিদ নির্মাণশৈলীর জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। স্থানীয় ব্যবসায়ী ইয়াসীন মির্জা ১৯৩১ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং শেষ হতে সময় লাগে প্রায় দশ বছর।
১৫০ মিটার দীর্ঘ এই দোতলা মসজিদে রয়েছে তিনটি বিশাল গম্বুজ, ছয়টি সুউচ্চ মিনার এবং ইতালি, জার্মানি ও ইংল্যান্ড থেকে আনা টাইলসের অলংকরণ। রড ছাড়াই সম্পূর্ণ ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত হওয়ায় এটি স্থাপত্যবিদদের কাছেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার গয়ঘর গ্রামের খোজার মসজিদ বা খোয়াজ মসজিদ জেলার অন্যতম প্রাচীন ইসলামী স্থাপনা। ধারণা করা হয়, চতুর্দশ শতকে মজলিশ আলম এটি নির্মাণ করেন। এছাড়া দরগা মহল্লায় হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন প্রাচীন মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে ধর্মপ্রাণ মানুষের ইবাদতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশায় নবাব আলী আমজদ খানের বাড়ি সংলগ্ন নবাববাড়ি মসজিদও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। মুঘল-পারস্য স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদ কারুকার্য ও নান্দনিকতার জন্য সুপরিচিত।
শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, সিলেটের প্রতিটি ঐতিহাসিক মসজিদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামের প্রচার, সুফি-সাধকদের ত্যাগ, জনপদের ইতিহাস এবং মানুষের গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস। তাই মসজিদের সংখ্যায় নয়, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক আবহের কারণেও সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ ধর্মীয় জনপদ হিসেবে নিজস্ব মর্যাদা ধরে রেখেছে।
সময়ের আলো/জোই