ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশ-বিদেশে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়েছে। তবে উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় রপ্তানি তো দূরের কথা, স্থানীয় বাজারের চাহিদাও পূরণ করা যাচ্ছে না। এর ফলে খুচরা বাজারে প্রকারভেদে প্রতি কেজি মধুর দাম বেড়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। একই সঙ্গে খাঁটি মধুর সংকটের সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভেজাল ব্যবসায়ীরা।
মৌয়াল ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাঁটি সুন্দরবনের মধু এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। পর্যাপ্ত মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় ক্রেতারা উচ্চমূল্যে মধু কিনেও প্রতারিত হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন ক্রেতাদের আস্থা কমছে, অন্যদিকে জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুর সুনাম ও ঐতিহ্যও হুমকির মুখে পড়ছে।
পরিবেশবিদ, মৌয়াল ও মধু ব্যবসায়ীদের মতে, উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ বনদস্যুদের পুনরুত্থান। দস্যুদের ভয়, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও মুক্তিপণের কারণে অনেক মৌয়াল এবার বনেই যাননি। যারা গিয়েছিলেন, তাদের অনেককেই মৌসুমের মাঝপথে ফিরে আসতে হয়েছে।
এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে খলিশা, গরান, কেওড়া ও বাইনসহ মধুর প্রধান উৎস গাছগুলোতে পর্যাপ্ত ফুল ফোটেনি। ফলে মৌচাকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এছাড়া অভয়ারণ্যের সীমানা বৃদ্ধি এবং মধু আহরণের সময়সীমা তিন মাস থেকে কমিয়ে দুই মাস করায় মৌয়ালদের প্রবেশযোগ্য বনাঞ্চলও সংকুচিত হয়েছে।
শরণখোলা উপজেলার উত্তর তাফালবাড়ী গ্রামের মৌয়াল ছগির হাওলাদার জানান, ১০ সদস্যের একটি দল নিয়ে তারা বনে গিয়েছিলেন। মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে বনদস্যু মেজো জাহাঙ্গীর বাহিনী তাদের নৌকায় হামলা চালিয়ে দুই মৌয়ালকে অপহরণ করে এবং মুক্তিপণ হিসেবে তিন লাখ টাকা দাবি করে। পরে দেড় লাখ টাকা দিয়ে তাদের মুক্ত করা হয়। এরপর আর মধু সংগ্রহ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘যে কয়দিন বনে ছিলাম, তাতে মাত্র দুই মণ মধু পেয়েছি। সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ হলেও শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছি।’
সুন্দরবন রক্ষায় কাজ করা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নূর আলম শেখ বলেন, বনদস্যু দমন, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে মধু আহরণের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এই শিল্প আরও বড় সংকটে পড়বে। পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা গড়ে না তুললে মৌমাছি ও মৌচাক সংরক্ষণও কঠিন হয়ে পড়বে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সুন্দরবনে মধু আহরণের মৌসুম চলে। ২০২৬ সালে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে মোট ৪২ দশমিক ১ টন মধু সংগ্রহ হয়েছে। এর মধ্যে শরণখোলা রেঞ্জে ১৩ দশমিক ৩ টন এবং চাঁদপাই রেঞ্জে ২৮ দশমিক ৮ টন। এ মৌসুমে মোট ১ হাজার ৪৫৩ জন মৌয়াল মধু সংগ্রহে অংশ নেন।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে একই দুই রেঞ্জে ২ হাজার ২৫০ জন মৌয়াল ৬৪ দশমিক ৭ টন মধু সংগ্রহ করেছিলেন। এর আগে ২০২৪ সালে ১০০ টন, ২০২৩ সালে ৯৫ টন, ২০২২ সালে ১০৫ টন এবং ২০২১ সালে ১০৪ দশমিক ৪ টন মধু আহরণ হয়েছিল। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের ব্যবধানে উৎপাদন প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘দস্যুদের অব্যাহত চাঁদাবাজি, অপহরণ ও নির্যাতনের কারণে গভীর বনের যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি মধু পাওয়া যায়, সেখানে অনেক মৌয়াল যেতে পারেননি। অনেকেই মৌসুমের মাঝপথে ফিরে এসেছেন। চাঁদা দিতে দিতে অনেকে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। চলতি মৌসুমে মধু কম আহরণের প্রধান কারণই হলো বনদস্যুদের পুনরুত্থান।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বনদস্যু দমন, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, জলবায়ু সহনশীল বন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং বাজারে ভেজাল মধু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুর ঐতিহ্য ও বাজার- উভয়ই ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সময়ের আলো/এসএকে