ফুটবলে বলা হয়, একজন গোলরক্ষক কখনো কখনো একটি দলের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াই যেন সেই কথারই বাস্তব প্রমাণ। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ, পেনাল্টি ঠেকানো, চাপের মুখে ঠান্ডা মাথায় বল বিতরণ। সব মিলিয়ে নকআউট পর্বের অন্যতম নায়ক হয়ে উঠেছেন গোলরক্ষকরা। আর সেই পারফরম্যান্সেরই প্রতিফলন ঘটেছে ফিফার সর্বশেষ শক্তিমানের তালিকায়।
ফিফা উন্নত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করে এই শক্তিমানের তালিকা প্রকাশ করে। গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে খেলা গড়ে তোলার দক্ষতা এবং গোল রক্ষায় কার্যকারিতা। এই দুই সূচকের সমন্বয়ে নির্ধারণ করা হয় একজন গোলরক্ষকের সামগ্রিক প্রভাব। গ্রুপপর্বে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মূল্য থাকলেও নকআউট পর্বে এসে গুরুত্ব পেয়েছে চাপের মুহূর্তে দলের জন্য পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সক্ষমতা। ফলে সর্বশেষ তালিকায় বড় উত্থান ঘটেছে কয়েকজন গোলরক্ষকের।
স্পেনের বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও পর্তুগালের দিয়াগো কস্তা ছিলেন ম্যাচের অন্যতম সেরা ফুটবলার। ছয়টি শটের মধ্যে পাঁচটি সেভ করে তিনি একাই ব্যবধান বড় হতে দেননি। পুরো টুর্নামেন্টে পাঁচ ম্যাচে প্রতিপক্ষের ২৩টি লক্ষ্যে থাকা শটের মধ্যে ১৯টি রুখে দিয়েছেন তিনি। নিশ্চিত গোলের বহু সুযোগও নষ্ট করেছেন কস্তা। তাই গোল রক্ষার সূচকে এখন তিনিই সবার ওপরে।
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে খেলা গড়ে তোলার সূচকে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন রনওয়েন উইলিয়ামস। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার কাছে অতিরিক্ত সময়ে হেরে বিদায় নেওয়া কেপভার্দের ভোজিনহাও দুই সূচকেই নিজের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। বল নিয়ন্ত্রণের সূচকে তিনি দ্বিতীয় এবং গোলরক্ষার সূচকে সপ্তম স্থানে আছেন।
জার্মানিকে বিদায় করে আলোড়ন তোলা প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলও আলোচনায় রয়েছেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে দল হারলেও পাঁচটি শটের মধ্যে চারটি সেভ করেন তিনি। পাশাপাশি নিশ্চিত গোলের একাধিক সুযোগ নষ্ট করে দেন এবং আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে সামগ্রিক তালিকায় দুই ধাপ এগিয়ে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন গিল। দুটি সূচকেই তার অবস্থান এখন তৃতীয়।
মেক্সিকোর বিপক্ষে ইংল্যান্ডের নাটকীয় জয়ের অন্যতম কারিগর ছিলেন জর্ডান পিকফোর্ড। পুরো ম্যাচে ইংল্যান্ডের বল দখলে ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। তবু গোলরক্ষক হিসেবে তিনিই দলকে চাপ সামলাতে সাহায্য করেন। পাঁচটি শটের মধ্যে তিনটি সেভ করার পাশাপাশি আক্রমণ গড়ে তুলতে একের পর এক কার্যকর পাস দেন তিনি। এই পারফরম্যান্সে আট ধাপ এগিয়ে সামগ্রিক তালিকার চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছেন পিকফোর্ড। গোলরক্ষার সূচকেও তিনি দশ ধাপ এগিয়ে এখন অষ্টম।
স্পেনের উনাই সিমনও নীরবে গড়ে চলেছেন অনন্য এক কীর্তি। পর্তুগালের বিপক্ষে দুটি শটের দুটিই রুখে দিয়ে টানা পঞ্চম বিশ্বকাপ ম্যাচে কোনো গোল হজম না করার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। পাশাপাশি বল বিতরণেও ছিলেন নিখুঁত। এই পারফরম্যান্সে তিনি ১২ ধাপ এগিয়ে প্রথম দশে জায়গা করে নিয়েছেন।
সুইজারল্যান্ডের গ্রেগর কোবেলও নিজের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। প্রতিপক্ষের তিনটি শটই ঠেকানোর পাশাপাশি বল বিতরণে ছিলেন নির্ভুল। পরে ভাগ্য নির্ধারণী শটেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে তিনি শক্তিমানের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে সুইসরা।
তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছেন নরওয়ের অরিয়ান নিয়ল্যান্ড। ব্রাজিলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ২-১ গোলের জয়ে প্রথমার্ধে ব্রুনো গিমারায়েসের পেনাল্টি ঠেকিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। পুরো ম্যাচে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলের জয়ে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন। এর পুরস্কার হিসেবে এক লাফে ১৮ ধাপ এগিয়ে শক্তিমানের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছেন নিয়ল্যান্ড। বল নিজেদের দখলে রেখে খেলা গড়ে তোলার সূচকেও তিনি এখন পঞ্চম স্থানে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব আবারও মনে করিয়ে দিল, একজন স্ট্রাইকার গোল করে ম্যাচ জেতাতে পারেন, কিন্তু একজন গোলরক্ষক একটি সেভ দিয়েই পুরো টুর্নামেন্টের গল্প বদলে দিতে পারেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই গল্পের প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছেন গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এই নীরব নায়করাই।