২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু মাঠের প্রতিযোগিতায় নয়, আর্থিক দিক থেকেও নতুন ইতিহাস গড়ছে। তবে রেকর্ড আয়ের এই যাত্রায় টিকেটের অস্বাভাবিক মূল্য, নতুন মূল্য নির্ধারণ নীতি এবং একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে ফিফা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন বাণিজ্যিক সাফল্যের পথে হাঁটছে ফিফা। আয় ও মুনাফার দিক থেকে আগের সব আসরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সংস্থাটির ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে টিকেটের লাগামছাড়া মূল্য এবং ফিফার নতুন নীতির কারণে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি টিকেট নিয়েও চলছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকে মনে করছেন, বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপের পর এবারই প্রথম তিনটি দেশে বসছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসর। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেওয়ায় টুর্নামেন্টের পরিধিও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। দল সংখ্যা বাড়ার ফলে ম্যাচের সংখ্যাও ৬৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০৪টি। ৩৯ দিনের এই আসর ফিফার জন্য অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে।
উত্তর আমেরিকার বড় স্টেডিয়ামগুলোর কারণে এবার প্রায় ৬৭ লাখ টিকেট বিক্রির সুযোগ রয়েছে, যা কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু টিকেট বিক্রি ও ভিআইপি হসপিটালিটি থেকেই প্রায় ৩ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ফিফা। তুলনায় ২০২২ সালের বিশ্বকাপে এই দুই খাত থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা।
এবারের আসরের অন্যতম আলোচিত বিষয় ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ বা চাহিদাভিত্তিক টিকেট মূল্য। এই পদ্ধতিতে যে ম্যাচের চাহিদা যত বেশি, তার টিকেটের দামও তত বাড়ে। ফলে জনপ্রিয় দল কিংবা নকআউট পর্বের ম্যাচের টিকেটের মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ দর্শকের সামর্থ্যরে বাইরে চলে গেছে।
ফিফা এটিকে বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সমর্থকদের অভিযোগ, এটি মূলত অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের কৌশল। তাদের মতে, এতে প্রকৃত ফুটবলপ্রেমীরা টিকেট কেনার সুযোগ হারাচ্ছেন। টিকেট কালোবাজারি ঠেকাতে ফিফার নিজস্ব রিসেল প্ল্যাটফর্ম থাকলেও সেখানেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে পুনঃবিক্রীত টিকেটের ওপর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়া হলেও এবার সেই হার বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে, যা নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেকেন্ডারি টিকেট বাজারকে ঘিরে। দেশটিতে পুনঃবিক্রীত টিকেটের মূল্যের ওপর কোনো আইনি সীমা না থাকায় কয়েক হাজার ডলারের টিকেটও কয়েক লাখ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। ফিফার দাবি, মূল্যসীমা নির্ধারণ করলে অবৈধ টিকেট ব্যবসায়ীরা অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যেত। তবে মেক্সিকোর মতো দেশে কঠোর আইনের কারণে নির্ধারিত দামের বেশি টিকেট বিক্রি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।
অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগ এবার ফিফাকে আইনি তদন্তের মুখেও ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির অ্যাটর্নি জেনারেলরা সংস্থাটির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছেন। অভিযোগ, টিকেট বিক্রি শুরুর পর স্টেডিয়ামের আসন বিন্যাস পরিবর্তন করে অনেক সাধারণ আসনকে ভিআইপি ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এতে আগে টিকেট কেনা অনেক দর্শক প্রতারিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও ফিফা বলছে, প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত আসন পরিকল্পনা ছিল কেবল একটি ধারণামূলক নির্দেশিকা।
সব বিতর্ক ও আইনি চাপের পরও অর্থনৈতিক সাফল্যের দিক থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফিফার জন্য নতুন মাইলফলক হতে যাচ্ছে। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের পুরো বাণিজ্যিক চক্রে সংস্থাটির মোট আয় প্রায় ১৪ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা আগের চক্রের তুলনায় ৭০ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা আয় হবে শুধু ২০২৬ সালেই। বিশ্ব ফুটবলের সম্প্রসারণের পাশাপাশি উত্তর আমেরিকার বিশাল করপোরেট বাজারকে কাজে লাগিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক বিশ্বকাপ আয়োজনের পথে এগোচ্ছে ফিফা। তবে এই সাফল্যের মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ সমর্থকদেরই।
সময়ের আলো/আআ