টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে গেছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাত প্রায় ৯টার দিকে খোয়াই নদীর পূর্ব তীরের চরহামুয়া-কালীগঞ্জ এলাকার বাঁধের একটি বড় অংশ আকস্মিকভাবে ধসে পড়ে। বাঁধ ভাঙার পর নদীর প্রবল স্রোতে পানি দ্রুত লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করায় চরহামুয়া, নারাইনপুর, বালিহাটা, সুঘর ও কৃষ্ণরামপুরসহ অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আকস্মিক এই বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারো মানুষ, সৃষ্টি হয়েছে চরম আতঙ্ক।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাত ৯টার দিকে বিকট শব্দে বাঁধটি ভেঙে যায়। চোখের পলকেই নদীর উপচে পড়া পানি তীব্র বেগে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও বিঘার পর বিঘা কৃষিজমি মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায়।
বন্যা ও ভাঙন আতঙ্কে গভীর রাতেই গ্রামবাসী তাদের গরু, ছাগল ও ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানের খোঁজে ছুটতে শুরু করেন। অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে স্থানীয় লস্করপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনসহ বিভিন্ন উঁচু স্থানে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন। হঠাৎ এমন বিপর্যয়ে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সব নিয়মকানুন উপেক্ষা করে খোয়াই নদী থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। এর ফলেই বাঁধটি গোড়া থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অবশেষে পাহাড়ি ঢলের প্রবল পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে বাঁধটি ভেঙে যায় এবং লোকালয় প্লাবিত হয়। ভবিষ্যতে এই এলাকার মানুষকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে খোয়াই নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে।
এদিকে পরিস্থিতির সার্বিক অবনতির আশঙ্কায় লস্করপুর ইউনিয়ন, পইল ইউনিয়ন, তেঘরিয়া ইউনিয়ন এবং ভাটি অঞ্চলের বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। রাতে নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয় প্রশাসন।
বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তীব্র স্রোতের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বাঁধ মেরামত করা সম্ভব না হলেও পানি কমলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। আপাতত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি প্রস্তুতির বিষয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, হবিগঞ্জে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। বর্তমানে জেলা তহবিলে ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল এবং ১৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুত আছে। এর মধ্যেই বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলায় ১৬২০ প্যাকেট শুকনো খাবার উপ-বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুর্গত মানুষের মাঝে দ্রুত এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শুরু হবে।
খোয়াই নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পুরো জেলা জুড়েই এখন বন্যা আতঙ্ক বিরাজ করছে। দুর্গত এলাকার মানুষ দ্রুত বাঁধ সংস্কার ও স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/জোই