চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা পৌর এলাকার জমিজমা-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে পলান আলী (৭৫) নামে এক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশী ইদবার মহুরী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালের গোবিন্দপুর তমালতলায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ প্রধান আসামিসহ ২ জনকে গ্রেফতার করেছে।
ঘাতক ইদবার একই পাড়ার মৃত ইসমাইলের ছেলে ও নিহত পলান হোসেন গোবিন্দপুর তমালতলা এলাকার মৃত ছয়রদ্দিনের ছেলে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন পলান আলী। শরীরের এক পাশ অবস হয়ে যাওয়ায় তিনি লাঠির সাহায্যে চলাফেরা করতেন। বয়সের ভার ও শারীরিক অক্ষমতার কারণে তিনি প্রায় পুরোপুরি পরিবারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের দাবি, প্রায় ৩০ বছর আগে ইদবার মহুরী ও তার ভাইদের কাছ থেকে তিন কাঠা জমি কিনেছিলেন পলান আলী। অভিযোগ রয়েছে, জমি বিক্রির সময় এক জায়গা দেখানো হলেও রেজিস্ট্রির সময় অন্য একটি গর্তের জমি লিখে দেওয়া হয়। পরে দেখানো জায়গায় মাটি ভরাট করে সেখানে বসতবাড়ি নির্মাণ করেন তিনি। কয়েক বছর পর ইদবার মহুরী ওই জমির মালিকানা অস্বীকার করলে বাধ্য হয়ে রেজিস্ট্রিকৃত জমিতে বাড়ি নির্মাণ করেন পলান আলী। কিন্তু সেখানে তিন কাঠার পরিবর্তে মাত্র দেড় কাঠা জমি পান। বাকি দেড় কাঠা বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি ঘিরেই দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকালে ইদবার মহুরী, তার স্ত্রী বেলি খাতুন, নাতি রিয়াদ ও পুত্রবধূ জেসমিন নাহার মিতু পলান আলীর বাড়িতে গিয়ে ঘর ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে একটি ঘরে তালা লাগিয়ে দেন। এতে বাধা দিলে পলান আলীর স্ত্রী ফরিদা খাতুনকে মারধর করা হয়। স্ত্রীর চিৎকার শুনে পলান আলী ঘর থেকে নেমে অন্য ঘরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে ইদবার মহুরী বাঁশের লাঠি দিয়ে তার ঘাড়ে সজোরে আঘাত করেন। আঘাতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্বজনরা দ্রুত তাকে আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্বজনদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
নিহতের নাতি ফয়সাল বলেন, জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। পরিকল্পিতভাবে আমার নানার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। জোর করে ঘর দখল করতে এসেই তারা তাকে হত্যা করেছে।
স্ত্রী ফরিদা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা তিন কাঠা জমি কিনেছিলাম। নানা কৌশলে আমাদের অন্য জায়গায় যেতে বাধ্য করা হয়। বাকি জমি চাইতেই আমার স্বামীকে মেরে ফেলল।
অভিযুক্ত ইদবার মহুরীর ভাতিজা লালন আলীও অভিযোগ করে বলেন, আমার চাচা এক জায়গা দেখিয়ে অন্য জায়গার জমি রেজিস্ট্রি করে প্রতারণা করেছিলেন। পরে জোর করে উচ্ছেদ করতে গিয়ে পলান আলীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শুধু তাদের সঙ্গেই নয়, তার সাঙ্গেসহ আরও অনেকের সঙ্গেও তিনি এমন প্রতারণা করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এ ঘটনায় নিহতের ছেলে রতন আলী বাদী হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
আলমডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বানী ইসরাইল বলেন, গোবিন্দপুর এলাকায় জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে লাঠির আঘাতে পলান আলী নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। নিহতের ছেলে বাদী হয়ে মামলা করেছেন। প্রধান অভিযুক্ত ইদবার মহুরী ও তার পুত্রবধূ জেসমিন নাহার মিতুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে।
ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গ্রামের গোরস্থানে পলান আলীর দাফন সম্পন্ন হয়। মৃত্যুর খবরে গোবিন্দপুর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। একই সঙ্গে এলাকায় বিরাজ করছে থমথমে উত্তেজনা। স্থানীয়রা ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাকি আসামিকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/জোই