টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। উপজেলার প্রায় সব নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গিয়ে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হলেও প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ সহায়তা এখনো অত্যন্ত সীমিত। সরকারি পর্যায়ে কিছু এলাকায় অল্প পরিসরে ত্রাণ বিতরণ শুরু হলেও অধিকাংশ দুর্গত মানুষের কাছে তা পৌঁছায়নি। অন্যদিকে কয়েকটি সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিজস্ব উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করলেও তা বিপুলসংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, হাজার হাজার বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, বাজার ও সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। সাতকানিয়া থানা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাতেও পানি ঢুকে পড়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাসমতের দোকান এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বুড়ির দোকান ব্রিজ এলাকায় প্রবল স্রোতের কারণে যান চলাচল বন্ধ থাকায় বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এছাড়া অভ্যন্তরীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বহু গ্রামের মানুষ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। রোগী, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের হাসপাতালে নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, শিশুখাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সোনাকানিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, দুই দিন ধরে ঘরের ভেতরে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। রান্না করতে পারছি না। শুকনো খাবার যা ছিল, প্রায় শেষ। এখনো কোনো ত্রাণ পাইনি। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
মাদার্শা ইউনিয়নের গৃহবধূ রহিমা বেগম বলেন, নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানি নেই। বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ পানি জোগাড় করতে পারছি না। সারাদিন আতঙ্কে থাকি, রাতে সাপ উঠে আসবে কি না সেই ভয়েও ঘুমাতে পারি না।
কেঁওচিয়া ইউনিয়নের দিনমজুর মহিউদ্দিন বলেন, চার দিন ধরে কোনো কাজ করতে পারিনি। ঘরে যা চাল-ডাল ছিল শেষ হয়ে যাচ্ছে। আয় না থাকায় পরিবারের খাবার জোগাড় করাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা।
ঢ্মেশা ইউনিয়নের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, আমনের বীজতলা আর সবজিখেত সব পানির নিচে। মাছের ঘের থেকেও মাছ ভেসে গেছে। একদিকে ফসলের ক্ষতি, অন্যদিকে ঘরেও পানি— সব মিলিয়ে আমরা নিঃস্ব হওয়ার পথে।
বন্যাকবলিত অনেক পরিবারের রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুই দিন ধরেই রান্না বন্ধ রয়েছে। কেউ শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন, আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের উঁচু ঘরে আশ্রয় নিয়ে রান্না করছেন। অনেক পরিবারের খাদ্যশস্য, কাপড়চোপড়, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পানিতে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বিশুদ্ধ পানির সংকট, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষকরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। কয়েক দিন ধরে কাজ না থাকায় অনেক পরিবারে খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে দুর্গত মানুষের অভিযোগ, ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় ত্রাণ কার্যক্রম খুবই সীমিত। অনেক দুর্গম এলাকায় এখনো কোনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি। কোথাও কোথাও অল্প পরিসরে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হলেও অধিকাংশ পানিবন্দি পরিবার এখনো সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে কিছু সংগঠন মাঠে থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নৌকার মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, শিশুখাদ্য ও পশুখাদ্য পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, কোথাও কেউ বিপদে পড়লে দ্রুত উদ্ধার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত আছি। উপজেলা প্রশাসনের কন্ট্রোলরুম সার্বক্ষণিক চালু রয়েছে। সবাইকে প্রয়োজন হলে কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।
এদিকে, স্থানীয়দের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে সাতকানিয়ার মানবিক সংকট আরও গভীর হবে। সে ক্ষেত্রে বৃহৎ পরিসরে সরকারি ত্রাণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ না করলে বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সময়ের আলো/জোই