অটোরিকশাই এখন ‘ঘর’, সন্তানদের নিয়ে কালভার্টে রাত কাটে দম্পতির

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা

সারাদেশ

কোমর সমান পানিতে ডুবেছে নিজের চেনা ঘর। চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে বিছানাপত্র থেকে শুরু করে সংসারের সব আসবাবপত্র। চুলোয় আগুন

2026-07-10T13:59:00+00:00
2026-07-10T13:59:00+00:00
 
  শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬,
২৬ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
অটোরিকশাই এখন ‘ঘর’, সন্তানদের নিয়ে কালভার্টে রাত কাটে দম্পতির
বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৯ পিএম 
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় দিন কাটছে এক পরিবারের। ছবি : সংগৃহীত
কোমর সমান পানিতে ডুবেছে নিজের চেনা ঘর। চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে বিছানাপত্র থেকে শুরু করে সংসারের সব আসবাবপত্র। চুলোয় আগুন জ্বলার উপায় নেই। এমন চরম সংকটে দুই বছরের দুধের শিশু আর ১৩ বছরের কিশোর ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাবেন, তা ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন মা তসলিমা আক্তার। অবশেষে ভিটেমাটি ছেড়ে ঠাঁই নিতে হলো খোলা আকাশের নিচে, এলাকার একমাত্র উঁচু কালভার্টটিতে। কিন্তু সেখানেও তিল ধারণের ঠাঁই নেই; মানুষ, গবাদিপশু আর জরুরি আসবাবপত্রে ঠাসা।

ঠিক এই মুহূর্তে তসলিমার সহায় হয়ে দাঁড়াল স্বামীর উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম- একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পানি থেকে বাঁচাতে স্বামী শাহাবুদ্দিন আগেই সেটি কালভার্টের ওপর রেখে এসেছিলেন। গত বুধবার থেকে সেই অটোরিকশার ছোট্ট আসনটিই এখন তসলিমা আর তার দুই সন্তানের ‘নতুন ঘর’।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে গত কয়েকদিনের ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় এমনই এক মানবিক ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায়ও কালভার্টের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই অটোরিকশায় দেখা গেল এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য। অটোরিকশার সিটে সামান্য একটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে অবুঝের মতো ঘুমিয়ে আছে দুই বছরের শিশু জান্নাতুল মাওয়া। আর বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে মায়ের সাথে বোনকে পাহারা দিচ্ছে ১৩ বছরের বড় ভাই বোরহান উদ্দিন। সেখানেই চলছে তাদের শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই।

শুধু তসলিমা নন, কালভার্টটিতে আশ্রয় নেওয়া সিংহভাগ পরিবারের গল্পটাই এখন এক। মাথার ওপর পলিথিন বা ত্রিপল টাঙিয়ে কোনোমতে টিকে আছেন তারা। দু-একটি পরিবার গরম খাবারের মুখ দেখলেও, অধিকাংশেরই দিন কাটছে কলা, মুড়ি আর চিড়া খেয়ে। আকস্মিক এই বিপর্যয় যেন সবার হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাঁশখালীর পুঁইছড়ি, ছনুয়া, শেখেরখীল, গন্ডামারা ও শীলকূপসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে পুকুর-জলাশয় সব একাকার হয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি। সরকারি ত্রাণের দেখা মিললেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য, ফলে বড় একটা অংশ এখনো ক্ষুধার্ত দিন কাটাচ্ছে।


অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে তসলিমার স্বামী শাহাবুদ্দীন বলেন, বুধবার রাতে চোখের পলকে পানি ঘরের ভেতর উঠে গেল। দেখতে দেখতে তা কোমর সমান। বাচ্চাদের বাঁচাবো নাকি ঘরের জিনিসপত্র, মাথায় কাজ করছিল না। বাধ্য হয়ে এই অটোরিকশায় এসে আশ্রয় নিয়েছি। জানি না কপালে আরও কত কষ্ট আছে।

একই কালভার্টে আশ্রয় নেওয়া স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা নজির আহমদ আক্ষেপ করে বলেন, জীবনে কত দুর্যোগ দেখলাম, কিন্তু এমন কষ্ট আর দেখিনি। পাহাড়ি ঢল আমাদের সব কেড়ে নিল। এখন এক ফোঁটা পানি আর এক মুঠো খাবারের জন্য হাহাকার করছি। এই দুর্ভোগ কবে শেষ হবে, ওপরওয়ালাই জানেন।

বন্যার পানি যতক্ষণ না কমছে, ততক্ষণ এই কালভার্ট আর চাকার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অটোরিকশাই তসলিমাদের মতো বহু মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   বাঁশখালী  বন্যা  পানি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: