ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বান্দরবানে ফসলি জমি, সবজিক্ষেত, মাছের পুকুর ও বিভিন্ন কৃষি খামার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ছবি : সময়ের আলো
‘আমার স্বপ্ন, পরিশ্রম আর সব মূলধন বানের জলে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন সব শেষ, বাঁচার আর কোনো পথ দেখি না’, কথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি বান্দরবান সদর উপজেলার রত্নপুর গ্রামের কৃষক মিন্টু কুমার তঞ্চঙ্গ্যা।
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বান্দরবান সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের গোয়ালাখোলা এলাকার রত্নপুর পাড়া, জিনিঅং পাড়া, দুংখি পাড়া, ডলুঝিড়ি পাড়া, রোয়াজা পাড়া, পুরাতন ব্রিকফিল্ড ও গোয়ালাখোলা পাড়ার শতাধিক কৃষকের ফসলি জমি, সবজিক্ষেত, মাছের পুকুর ও বিভিন্ন কৃষি খামার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই বছরের সঞ্চয় ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারিয়ে পথে বসার আশঙ্কায় দিন কাটছে এসব কৃষক পরিবারের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গোয়ালাখোলা এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। ধান, ধনিয়াপাতা, পানের বরজ, পেঁপে বাগান, বিভিন্ন সবজিক্ষেত ও মাছের পুকুর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। ফলে ফসল হারিয়ে এখন তারা ঋণ পরিশোধ নিয়েও চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। ছবি : সময়ের আলো
৬৫ বছর বয়সী কৃষক মিন্টু কুমার তঞ্চঙ্গ্যা জানান, তার এক বিঘা ধনিয়াপাতার ক্ষেত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। দুটি পুকুরে প্রায় ৫৫ হাজার টাকার মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। বন্যার পানিতে পুকুর তলিয়ে সব মাছ ভেসে গেছে। সব মিলিয়ে তার প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
একই গ্রামের কৃষক শুক্র তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, তার আড়াই বিঘা ধনিয়াপাতার ক্ষেত এবং প্রায় এক হাজার ফলন্ত পেঁপে গাছ পানিতে তলিয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
স্ফসলিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ছবি : সংগৃহীত
কৃষক সজিব তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ২০ শতক জমিতে ধনিয়াপাতার চাষ করেছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই বাজারে তোলার কথা ছিল। কিন্তু এক রাতের বন্যায় পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। এতে তার প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
পুরাতন ব্রিকফিল্ড এলাকার কৃষক মো. দেলোয়ার হোসেন (৬০) বলেন, তার পানের বরজ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, এত বড় ক্ষতি জীবনে কখনো দেখিনি। আবার নতুন করে শুরু করার মতো সামর্থ্যও নেই।
একই এলাকার কৃষক মো. ওসমান (৬০) জানান, এক বিঘা করলা ও দেড় বিঘা শসার চাষে এক লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছিলেন। ক্ষেত নষ্ট না হলে অন্তত আড়াই লাখ টাকার সবজি বিক্রি করতে পারতেন। কিন্তু বন্যার পানিতে সব ডুবে যাওয়ায় সব আশা শেষ হয়ে গেছে।
রত্নপুর পাড়ার কারবারী ও কৃষক নীল কান্তি (কনক) তঞ্চঙ্গ্যা জানান, মাছভর্তি তার দুটি পুকুরের বাঁধ ভেঙে কাতলা, রুই ও মৃগেলসহ সব মাছ ভেসে গেছে।
মাছভর্তি পুকুর ভাসে গেছে। ছবি : সময়ের আলো
ধারদেনা করে প্রায় দুই লাখ টাকার মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। এছাড়া ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে ধনিয়াপাতার চাষ করেছিলেন, সেটিও সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে।
কপালে হাত রেখে তিনি বলেন, এখন পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ধারদেনা কীভাবে শোধ করব, সংসার কীভাবে চালাব, কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, বন্যার পানি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হবে। পরে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।