‘৬০ বছরে অনেক বন্যা দেখেছি, এমন অসহায় অবস্থা দেখিনি’

সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সারাদেশ

৬০ বছর বয়সী আব্দুল জলিল কাঁপা কণ্ঠে বলেন, এত বয়সে অনেক বন্যা দেখেছি, কিন্তু এমন অসহায় অবস্থা দেখিনি। পানি বাড়তেই

2026-07-10T18:25:40+00:00
2026-07-10T18:25:40+00:00
 
  শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬,
২৬ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
‘৬০ বছরে অনেক বন্যা দেখেছি, এমন অসহায় অবস্থা দেখিনি’
সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ৬:২৫ পিএম 
‘৬০ বছরে অনেক বন্যা দেখেছি, এমন অসহায় অবস্থা দেখিনি’
৬০ বছর বয়সী আব্দুল জলিল কাঁপা কণ্ঠে বলেন, এত বয়সে অনেক বন্যা দেখেছি, কিন্তু এমন অসহায় অবস্থা দেখিনি। পানি বাড়তেই আছে। আমরা শুধু অপেক্ষা করছি, কেউ যদি একটু খাবার আর বিশুদ্ধ পানি নিয়ে আসে। 

বন্যার তৃতীয় দিনেও এমনই আর্তনাদ এখন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তেমুহনি গ্রামে। চারদিকে শুধু পানি। যত দূর চোখ যায়, ঘরবাড়ি, উঠান, রাস্তা, পুকুর— সব একাকার। কোথাও টিনের চাল দেখা যাচ্ছে, কোথাও শুধু গাছের মাথা। মাঝেমধ্যে একটি নৌকা নীরবে ভেসে যাচ্ছে। গ্রামের প্রবেশমুখে দাঁড়ালেই মনে হয়, জনপদটি যেন নদীর বুকে ভাসছে। কোথাও আর উঠান নেই, নেই গ্রামের চিরচেনা মেঠোপথ। টিনের ঘরের চূড়া, সুপারি ও নারকেল গাছের মাথা আর বিদ্যুতের খুঁটি ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না।  

শুক্রবার (১০ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের একটি দোতলা ভবনের ওপর আশ্রয় নিয়েছে অন্তত চারটি পরিবার। একটি কক্ষে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন প্রায় ৩০ জন। শিশুদের কান্না, বৃদ্ধদের অসহায় মুখ আর মায়েদের উৎকণ্ঠা যেন পুরো পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে।  

বন্যার টানা তিন দিন পরও গ্রামের অধিকাংশ একতলা বসতঘরে গলাসমান পানি। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা আরও বেশি। ঘরের দরজা-জানালা, খাট, আলমারি, রান্নাঘর— সবই পানির নিচে। অনেকেই শেষ মুহূর্তে কিছু কাপড়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর শিশুদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন পাশের দোতলা বাড়িতে। যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, তারা ঘরের মাচা কিংবা উঁচু স্থানে কোনোমতে টিকে আছেন।  

আশ্রয় নেওয়া গৃহবধূ আছিয়া খাতুন বলেন, আমাদের ঘরে কোমরেরও ওপরে পানি। নিচে কিছুই নেই। চাল-ডাল, কাপড়, বিছানা— সব পানিতে নষ্ট হয়েছে। তিন দিন ধরে ঠিকমতো রান্না হয়নি। বাচ্চারা শুধু খাবার চায়, কিন্তু দেওয়ার মতো কিছু নেই। 

গ্রামের ভেতরে নৌকায় চলতে চলতে দেখা যায়, অধিকাংশ নলকূপ পানির নিচে। বিশুদ্ধ পানির সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে। কয়েকজন তরুণ দূরের একটি উঁচু এলাকা থেকে বোতলজাত পানি এনে মানুষদের মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছেন। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

এক নারী বলেন, পানির জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে। বাচ্চাদের কী পানি খাওয়াব? বাধ্য হয়ে পানি ফুটিয়ে খাচ্ছি। কিন্তু সবাই তো সেটাও পারছে না।

গ্রামের দিনমজুর মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, চার দিন ধরে কোনো কাজ নেই। আয় নেই। ঘরে খাবারও নেই। এখন ত্রাণ ছাড়া বাঁচার কোনো উপায় দেখি না। 


বন্যায় সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। একদিকে খাবারের সংকট, অন্যদিকে বিশুদ্ধ পানির অভাব। কয়েকজন শিশুকে জ্বর ও ডায়রিয়ার উপসর্গ নিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ নেই। গ্রামের ভেতরে কোনো যানবাহন চলতে পারছে না। রোগী হাসপাতালে নিতে হলে নৌকায় করে মূল সড়কে যেতে হচ্ছে।

গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, আমনের বীজতলা শেষ। সবজিখেত শেষ। পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। গরুগুলোকে কোনো রকমে উঁচু জায়গায় রেখেছি। কিন্তু খাবার নেই। বন্যা নামলেও কীভাবে আবার শুরু করব, জানি না। 

তেমুহনি গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারও রান্নাঘর ভেঙে গেছে, কারও ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে, কারও আবার ঘরের ভেতরে থাকা সব আসবাব নষ্ট হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। মোবাইল ফোন চার্জ দিতে না পারায় অনেকেই স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তিন দিন ধরে পানিবন্দী থাকলেও এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। কেউ কেউ জানিয়েছেন, আশপাশের কয়েকটি এলাকায় সীমিত পরিসরে ত্রাণ দেওয়া হলেও তাদের গ্রামে কোনো সহায়তা আসেনি। ফলে অনেক পরিবার দিনে একবার খাবার খেয়ে সময় পার করছে, আবার কেউ শুকনো মুড়ি বা বিস্কুট খেয়েই দিন কাটাচ্ছেন।

ওয়াহিদুল ইসলাম নামের গ্রামের এক তরুণ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বন্যার খবর সবাই জানে। কিন্তু আমাদের গ্রামে কেউ এসে দেখুক মানুষ কী অবস্থায় আছে।

সরেজমিনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে দেখা যায়, মানুষের মুখে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত তিনটি শব্দ—খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও উদ্ধার। কেউ বিলাসিতা চান না, চান না বিশেষ কোনো সুবিধাও। তাদের একটাই দাবি— দ্রুত নৌকায় করে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হোক।

গ্রাম ছেড়ে ফেরার সময়ও কয়েকজন শিশু রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের ধারণা, হয়তো এবার কোনো নৌকা খাবার নিয়ে আসবে। কিন্তু অপেক্ষার সেই প্রহর যেন শেষ হচ্ছিল না। 

তেমুহনি গ্রামের এই দৃশ্য শুধু একটি গ্রামের নয়, এটি সাতকানিয়ার বন্যাকবলিত অসংখ্য গ্রামের বাস্তব চিত্র। যেখানে মানুষ আজ শুধু বন্যার পানির সঙ্গে নয়, ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা এবং উপেক্ষার সঙ্গেও লড়াই করছে। 



সময়ের আলো/ইউএমএইচ



  বিষয়:   বন্যা  সাতকানিয়া  চট্টগ্রাম 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: