অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে, যাতায়াতে ১০ টাকার ভাড়া ১০০

বান্দরবান সংবাদদাতা

সারাদেশ

‘আমাদের বড় কোনো চাওয়া নেই। শুধু এক মুঠো চাল বা একটু ভাত পেলেই হবে। আমরা বড়রা না খেয়ে থাকতে পারব,

2026-07-10T15:26:13+00:00
2026-07-10T15:26:13+00:00
 
  রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
২ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে, যাতায়াতে ১০ টাকার ভাড়া ১০০
বান্দরবান সংবাদদাতা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ৩:২৬ পিএম 
অতি ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের জেলা শহর থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছবি : সংগৃহীত
‘আমাদের বড় কোনো চাওয়া নেই। শুধু এক মুঠো চাল বা একটু ভাত পেলেই হবে। আমরা বড়রা না খেয়ে থাকতে পারব, কিন্তু আমাদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে তো বাঁচাতে হবে।’ চোখে জল আর কণ্ঠে বুকফাটা আকুতি নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বান্দরবানের লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ার ম্রাসংচিং ও ক্রইংসাংপ্রু মারমাসহ অন্যান্য বাসিন্দারা।

টানা পাঁচ দিনের অতি ভারী বর্ষণ ও সাঙ্গু-মাতামুহুরীর উপচে পড়া পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের জেলা শহর থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ এখন পানিবন্দি। এই পরিস্থিতিতে লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ার প্রায় ৬০-৬৫টি পরিবারের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছে পাশের এক দুর্গম পাহাড়ের বনে। তিন দিন ধরে কোলের শিশুদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে কাটছে তাদের রাত। সাথে আনা যৎসামান্য শুকনো খাবারও ফুরিয়ে গেছে। ঘর থেকে চাল, কাপড় কিংবা কোনো আসবাবপত্র বাঁচানোর সুযোগটুকুও পাননি তারা।

বান্দরবান পৌর এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নজরদারি ও সহায়তা দেওয়া হলেও, লেমুঝিড়ির মতো বিচ্ছিন্ন ও যোগাযোগহীন পাহাড়ি অঞ্চলের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বনের ভেতরে ও পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়া দুর্গতদের অভিযোগ, চারপাশ পানি দিয়ে বিচ্ছিন্ন থাকায় এখনো কোনো সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য তাদের কাছে পৌঁছায়নি।

বান্দরবান পৌরসভার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিশালপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া ও মেম্বারপাড়ার মতো নিম্নাঞ্চলগুলো কোথাও কোমর, আবার কোথাও গলা সমান পানিতে ডুবে গেছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষ ছুটছে আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে।

পৌরসভার বালাঘাটা এলাকায় প্রধান সড়ক এখন নদীর রূপ নিয়েছে, যেখানে মানুষ যাতায়াত করছে নৌকায় বা ভ্যানে। এই দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে গণপরিবহনে চলছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মহোৎসব। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ কালাম জানান, স্বাভাবিক সময়ে টমটমে করে যে পথ যেতে ১০ টাকা লাগতো, এখন সেই পথের অর্ধেক পার হতেই ১০০ টাকা গুনতে হচ্ছে।

সামর্থ্যহীন আবু তালেব জানান, এই বাড়তি ভাড়া দেওয়ার টাকা না থাকায় কোমর সমান নোংরা পানি মাড়িয়েই তাকে বাজারে যেতে হচ্ছে। 

আমবাগানপাড়ার বাসিন্দা উমং প্রু মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সড়কের ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত না করায় প্রতি বছরই এই একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় (সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, আলীকদম, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি) মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। কেবল সদর উপজেলার ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রেই চার হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে মোবাইল নেটওয়ার্ক বিপর্যস্ত থাকায় অন্যান্য উপজেলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেতে বেগ পেতে হচ্ছে।


পানি উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানিয়েছেন, মাতামুহুরী ও সাঙ্গু- উভয় নদীর পানিই এখন চরম বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে মাতামুহুরীর পানি বিপৎসীমার (১১.৮০ মিটার) অনেক ওপরে ১৩.৪৪ মিটারে এবং সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার (১৪.৮০ মিটার) ওপরে ১৫.৫৫ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছিল।

আবহাওয়া অফিসের অফিসার ইনচার্জ কুমার মণ্ডল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯৬ মিলিমিটার এবং বিগত ৯৬ ঘণ্টায় মোট ৭৬০ মিলিমিটার অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমতা আফরিন জানিয়েছেন, পানিবন্দি বম হোস্টেল ও ত্রিপুরা হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পাঠানো হয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জনপ্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে পড়া অসহায় মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া।

সময়ের আলো/জেডআই
Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: