রাজাপুরে প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ১৫ কোটির ‘লুটপাট রেকর্ড’

আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি

সারাদেশ

আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী শাসন আমল থেকে শুরু করে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক প্রভাব—সব পরিস্থিতিতেই বহাল তবিয়তে আছেন

2026-07-13T18:11:24+00:00
2026-07-13T20:10:52+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
রাজাপুরে প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ১৫ কোটির ‘লুটপাট রেকর্ড’
আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৬:১১ পিএম  আপডেট: ১৩.০৭.২০২৬ ৮:১০ পিএম
রাজাপুর টিঅ্যান্ডটি সড়কের ভাঙা সেতু। ছবি : সময়ের আলো
আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী শাসন আমল থেকে শুরু করে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক প্রভাব—সব পরিস্থিতিতেই বহাল তবিয়তে আছেন ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)-র এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। 

দুর্নীতিপরায়ণ ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ, ভুয়া বিল পাস, কাজ না করে বরাদ্দ লোপাট এবং সরকারি মালামাল চুরির মাধ্যমে তিনি এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। সম্প্রতি উপজেলা বিএনপির প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক নাসিম আকনের ভাইয়ের পাওনা বিল আটকে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই প্রকৌশলীর দুর্নীতির থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে।

স্থানীয় ঠিকাদারদের সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনের প্রভাবে গঠিত দলীয় সিন্ডিকেটের সহায়তায় অনিয়ম শুরু করেন অভিজিৎ মজুমদার। তবে সাবেক ওই এমপি কাজের কমিশন না নেওয়ায় ঠিকাদার ও প্রকৌশলী মিলে অনায়াসে শতকোটি টাকার ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প তৈরি করে অর্থ লোপাট করেন।


২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজের চেয়ার বাঁচাতে অভিজিৎ আশ্রয় নেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাসিম আকনের ডেরায়। ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর নাসিম আঁকন মারা যাওয়ার আগে প্রকৌশলীর এই লুটপাটের প্রমাণ হাতেনাতে ধরে ফেলেছিলেন। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে তাদের দুর্নীতির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। স্থানীয় ঠিকাদাররা তার বিরুদ্ধে একাধিকবার আন্দোলন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তিনি সবসময় পার পেয়ে গেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ উপজেলায় আইবিআরপি প্রকল্পের আওতায় আরসিসি ৫০টি গার্ডার সেতু নির্মাণের জন্য কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। যার চূড়ান্ত বিল প্রদান করেন অভিজিৎ মজুমদার।

৫০টি সেতুর পাইলিং নির্মাণ না করে শুধু বেইজ ঢালাই দিয়ে ঠিকাদারদের অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়। বিনিময়ে প্রতিটি সেতু থেকে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৫ কোটি টাকা ঘুষ নেন এই প্রকৌশলী।

এলজিইডিতে মাত্র ২টি সেতু চলাচলের অনুপযোগী দেখানো হলেও বাস্তবে গালুয়া, নাপিতের হাট, হাজিরহাট, শুক্তাগড় ও মোল্লারহাট সড়কের প্রায় ডজনখানেক সেতুর কোনো সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) নেই। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুগুলো এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, যা কেবল সাইকেল ও অটোরিকশা পারাপারের কাজে লাগছে।

আইবিআরপি প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, পুরনো লোহার সেতু ভেঙে আরসিসি সেতু করার সময় লোহার মালামালের ছবি ও তালিকা সংরক্ষণ করতে হয় এবং মালামাল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) জিম্মায় রাখতে হয়। কিন্তু প্রতিটি লোহার সেতু ভাঙার পর গড়ে ১০ লাখ টাকা মূল্যের মালামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে আরও ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন অভিজিৎ।

এ বিষয়ে গালুয়া ও সাতুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং প্যানেল চেয়ারম্যানরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এলজিইডি কোনো দিনই রেজুলেশনের মাধ্যমে লোহার বিম, অ্যাঙ্গেল বা নাটবল্টু ইউপিতে জমা দেয়নি। উল্টো চেয়ারম্যানরা চোরাই মালামাল জব্দ করলে প্রকৌশলী ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তা নিয়ে যান। এমনকি রাজাপুর টিঅ্যান্ডটি সড়কের একটি লোহার সেতু ভাঙার মালামালও ঠিকাদার সাখাওয়াত হোসেন রাব্বির যোগসাজশে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থ বছরে এডিপি প্রকল্পের অধীন ৫টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ কাগজের কলমে দেখিয়ে শতভাগ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো হলো— আংগারিয়া পাকা রাস্তা হতে খলিল মাস্টারের বাড়ি এবং আলগী জামে মসজিদ হতে জালাল সিকদারের বাড়ি পর্যন্ত ইট সলিং ও মাটির কাজ, রাজাপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার মেরামত ও আসবাবপত্র ক্রয়, বামনকাঠি হাই স্কুল ও চরকেওতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মেরামত।

এ ছাড়া মজিবুর রহমান নামে এক সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে প্রকৌশলী নিজে ২০ লাখ টাকার কাজ করিয়ে সিংহভাগ অর্থ পকেটে পোরেন। সাব-কন্ট্রাক্টর মজিবুর নিজেই স্বীকার করেছেন, ঢালাইয়ের সময় সাইটে এসে প্রকৌশলী তার কাছ থেকে খরচের কথা বলে নগদ ৫ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। পাশাপাশি আম্ফান ও গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প থেকেও কাজ না করে ৭০ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

রাজাপুরের স্থানীয় ঠিকাদার ও বিএনপি নেতা হায়দার হোসেন বলেন, অভিজিৎ মজুমদার এলজিইডি বিভাগকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়েছেন। ওটিএম পদ্ধতিতে নিজের পছন্দের ঠিকাদার ও বেনামে নিজের লাইসেন্সে কাজ করাচ্ছেন। তার খুঁটির জোর অনেক শক্ত। সম্প্রতি তার দুর্নীতির কারণে শুক্তাগড় ইউনিয়নের সাংগর গোপালপুর সড়কে ৪২ লাখ টাকার একটি নির্মাণাধীন সেতু হস্তান্তরের আগেই ভেঙে পড়েছে।

অন্যান্য ঠিকাদারদের অভিযোগ, গত ৩ বছরে সব কাজের বিল ছাড়তে ২ শতাংশ হারে প্রায় ২ কোটি টাকা কমিশন নিয়েছেন তিনি। এসএ ট্রেডিং কর্পোরেশন'-এর ঠিকাদার মো. শহিদ জানান, নৈকাঠি লেবুবুনিয়ার রাস্তা মেরামতের বিল আটকে এসও’র সহায়তায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং নলবুনিয়া রাস্তার কাজের জন্য মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়েছেন এই প্রকৌশলী।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার বলেন, আমার যোগদানের পর ১৭টি গার্ডার সেতু নির্মাণ হয়েছে এবং সব মালামাল ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ছবি ও তালিকা দফতরে আছে। টিঅ্যান্ডটি সড়কের লোহার মালামাল ঠিকাদারের জিম্মায় রাখা হয়েছে। এডিপির সাব-কন্ট্রাক্টর মজিবুরকে চিনলেও তার মাধ্যমে কাজ করানোর বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। বিএনপি নেতা নাসিমের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, নাসিম ভাইয়ের পাওনা বিলের চেয়ে তার ভাই ফিরোজ আলম অতিরিক্ত টাকা দাবি করায় আমি তা দিইনি। তাই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন।

রাজাপুরের ডহরশংকর এলাকায় নির্মিত সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) বিহীন একটি পরিত্যক্ত গার্ডার সেতু
  বিষয়:   রাজাপুর  প্রকৌশলী  কোটি  লুটপাট  রেকর্ড  ঝালকাঠি 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: