আষাঢ়-শ্রাবণের আকাশে মেঘ জমলেই বুক কেঁপে ওঠে নড়াইল সদর উপজেলার দূর্বাজুড়ি, সীতারামপুর কিংবা হিজলডাঙ্গার মানুষের। বর্ষা নামলেই এই গ্রামীণ জনপদগুলো যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। মাঠের ফসল ঘরে তোলা তো দূরের কথা, মাত্র ২ কিলোমিটার কাঁচা সড়কের কাদার চাদরে ঢাকা পড়ে যায় হাজারো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। যাতায়াতের এই চরম দুর্ভোগের কারণে এলাকার তরুণ-তরুণীদের বিয়ে পর্যন্ত ভেঙে যাচ্ছে। বছরের পর বছর জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসের বাণী শুনলেও বাস্তবে এই সড়কগুলোর কোনো উন্নয়ন ছোঁয়া লাগেনি।
সদর উপজেলার মূলিয়া ইউনিয়নের দূর্বাজুড়ি গ্রাম থেকে সীতারামপুর অভিমুখী গ্রামীণ সড়কটির পাশে থাকা কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের পাকা রাস্তার দাবি বহু পুরোনো।
দূর্বাজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের গ্রামে তিন থেকে চারবার এমপি এসে রাস্তা দেখে গেছেন। তারা আশ্বস্ত করে যান রাস্তা হবে, কিন্তু বাস্তবে আর হয় না। এই বর্ষা মৌসুমে যাতায়াতের চরম কষ্টের কারণে আমাদের গ্রামের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে পর্যন্ত হতে চায় না। অন্য এলাকার মানুষ কাদার ভয়ে এখানে আত্মীয়তা করতে চায় না। আমরা দ্রুত এই রাস্তা পাকা চাই।
শুধু এই দুই গ্রামই নয়, হিজলডাঙ্গা ও ইচড়বাহাসহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের চলাচল এই রাস্তাতেই। বর্ষা এলেই কাদায় ডুবে যাওয়া এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের জুতো হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে যেতে হয়।
কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমীর গোলদার বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে ওঠে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হয়। রাতে হঠাৎ কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কোনো যানবাহন পাওয়া যায় না। রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্ভোগের এই চিত্র শুধু এই এলাকাতেই নয়, জেলার তিনটি উপজেলাতেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক এখনও কাঁচা রয়ে গেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, নড়াইল জেলায় মোট ৩ হাজার ২২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ১ হাজার ৪৪৭টি সড়ক রয়েছে, যার ৬০ শতাংশই এখনও কাঁচা।
উপজেলাওয়ারী কাঁচা সড়কের চিত্র- নড়াইল সদরে মোট ১ হহাজার ১৮১ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৭৩৮ কিলোমিটারই কাঁচা ৬২ শতাংশ, লোহাগড়ায় মোট ১ হাজার ১৯৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৭৮৯ কিলোমিটার কাঁচা ৬০ শতাংশ, কালিয়ায় মোট ৭৪৫ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৪৩৩ কিলোমিটার কাঁচা ৫৮ শতাংশ।
গ্রামীণ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ লাঘবে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ কিছু নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এলজিইডিতে নতুন সড়ক তালিকা আইডিভুক্ত (গেজেট) করার জন্য ইতোমধ্যে ৯৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ১ হাজার ১০০টি কাঁচা সড়কের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এর পাশাপাশি আরও ২৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ২১৪টি কাঁচা সড়ক নতুন করে তালিকাভুক্ত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
নড়াইল এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার ইকরামুল কবীর বলেন, জেলায় ৬০ শতাংশ রাস্তা এখনও কাঁচা আছে। বর্তমান অর্থ বছরে কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু রাস্তা সংস্কারের জন্য প্রক্রিয়াধীনের পাশাপাশি কিছু রাস্তার টেন্ডার চলছে। ‘নড়াইল জেলা অবকাঠামো উন্নয়ন’ ও ‘বৃহত্তর যশোর জেলা অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্প দুটি পাস হয়ে গেলে আগামী অর্থ বছরে কাঁচা রাস্তার হার ৫০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে পারব।
ভুক্তভোগী গ্রামীণ মানুষের দাবি, শুধু খাতা-কলমে বা তালিকায় নাম ওঠানো নয়, বর্ষার এই চরম নরকযাতনা থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে গ্রামীণ সড়কগুলো যেন অতি দ্রুত বাস্তবে পাকাকরণ করা হয়।
সময়ের আলো/জোই