টানা বৃষ্টিতে পানিময় রাজধানী ঢাকার অলিগলি। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। ঘর থেকে বের হলেই দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে তাদের। বৃষ্টিতে বেশিরভাগ মূল সড়ক থেকে অলিগলিতে দেখা দিয়েছে ব্যাপক জলাবদ্ধতা। যদিও গত কয়েক দিনের চেয়ে রাজধানীতে জলাবদ্ধতা অনেকটা কম ছিল সোমবার।
রোববার (১২ জুলাই) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় পানি পুরোপুরি সরেনি। ফলে সেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে, তাই যান চলাচলেও দেখা দিয়েছে ধীরগতি।
সোমবার ছিল সরকারি-বেসরকারি ও অফিস-আদালতের কর্মদিবস। ভোররাত থেকে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ার কারণে বিপাকে পড়তে চাকরিজীবী মানুষদের। জলাবদ্ধতা, ধীরগতির যান চলাচল এবং দীর্ঘ যানজটের কারণে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে। বিপাকে পড়েন হাসপাতাল এলাকায় রোগীর স্বজনরাও।
বেশিরভাগ হাসপাতালের সামনের প্রধান সড়ক, জরুরি বিভাগের প্রবেশপথ, প্রশাসনিক ভবন, মর্গসংলগ্ন এলাকা ও বাগানসংলগ্ন স্থানে ছিল থই থই পানি। এতে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ফলে ছাতা মাথায়, প্যান্ট গুটিয়ে, কাদাপানি মাড়িয়ে অফিসগামী মানুষ আর জীবিকার তাগিদে বের হওয়া মানুষের ভোগান্তির চিত্র ছিল অবর্ণনীয়। ময়লা ও কাদায় ভরা সড়ক ও অলিগলি। হেঁটে চলা দুষ্কর।
প্যাক-কাদায় গা ঘিনঘিন অবস্থা। দুর্ভোগ আরও বেড়েছে রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা কম থাকার কারণে। গন্তব্যে যেতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাদের। এই সুযোগে যানবাহন চালকরাও ভাড়া চেয়েছেন কয়েকগুণ বেশি।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, সোমবার ভোররাত থেকে বিরতিহীন বৃষ্টিতে রাজধানীর গুলশান, বনানী, কাকলী ও বারিধারাসহ মোহাম্মদপুরের একাংশ, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি, মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেটমুখী নতুন সড়ক, খামারবাড়ী থেকে ফার্মগেট, ফার্মগেট থেকে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকা, শনিরআখড়া, দৈনিক বাংলা মোড়, ফকিরেরপুল, মতিঝিল, পুরান ঢাকার বংশাল ও নাজিমউদ্দিন রোড, ধানমন্ডি, মিরপুর ১৩, কালশী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, মিরপুর, ইসিবি চত্বর, খিলক্ষেত, হাতিরঝিলের একাংশ, গুলশান লেকপাড়, কালাচাঁদপুর এবং বারিধারার সংযোগ সড়কসহ রাজধানীর অসংখ্য সড়ক ও অলিগলিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
ছাতা মাথায় বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন সাধারণ মানুষ। কেউ কেউ আবার বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়ায় রিকশা কিংবা সিএনজিতে উঠছেন। আবার কেউ কেউ ভিজে ভিজেই গন্তব্যে পৌঁছেছেন।
রাজধানীর রামপুরা এলাকা থেকে এসেছে পল্টন অফিসে। সবুর খান একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। তিনি বলেন, সোমবার সকাল থেকেই বৃষ্টি, যেহেতু চাকরি করি তাই বাধ্য হয়ে বৃষ্টির মধ্যেই আসতে হয়েছে। বৃষ্টির কারণে সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যা তুলনামূলক কম রয়েছে রাস্তায়। এই সুযোগে প্রতিদিন যে ভাড়ায় সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাই, এখন তার দ্বিগুণ গুনতে হয়েছে। বৃষ্টি দেখলেই এদের ভাড়া বেড়ে যায়। আমাদের তো আর উপায় নেই, অফিসে তো সময়মতো পৌঁছাতে হবে। সব মিলিয়ে ভোগান্তির শেষ নেই।
ভাড়া বেশি নেওয়ার পেছনে যুক্তি তুলে সিএনজিচালক সোহানুর রহমান বলেন, বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালানো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তায় পানি জমে থাকে, গাড়ির ইঞ্জিনে সমস্যা হয়, যাত্রীও কম পাওয়া যায়। এ জন্যই একটু বেশি ভাড়া চাইতে হয়। জোর করে তো নিই না, যাত্রী রাজি হলেই যাই। জলাবদ্ধতায় রাস্তার মধ্যে আমার সিএনজির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়, সারা দিনে আর কোনো আয় হলো না।
পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের আলী নেকি দেউড়ি এলাকার ভাড়াটিয়া সৈকত বলেন, গত রোববারের ভারী বৃষ্টিতে এখানে কোমরসমান পানি জমেছিল। রাতে পানি নেমে গেলেও সোমবার সকালে আবার বৃষ্টি শুরু হওয়ায় নতুন করে পানি জমেছে।
একই এলাকার আগামাসি লেনের বাসিন্দা শেখ রবিউল বলেন, রোববার এই এলাকায় পানি জমেছিল। সোমবার সকাল থেকে আবার বৃষ্টি হওয়ায় ধীরে ধীরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান বলেন, গত রোববারের টানা বর্ষণে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে অনেক প্রধান সড়কেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সোমবার সকালের বৃষ্টিতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি না হলেও রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়কে তুলনামূলক কম মাত্রায় পানি জমেছে।
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দফতরের মিডিয়া কর্মকর্তা রাশেদ বিন খালেদ বলেন, সোমবার সকালের বৃষ্টিকে কেন্দ্র করে ঢাকা শহরে কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন এলাকায় সামান্য জলাবদ্ধতা রয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো জরুরি পরিস্থিতির তথ্য আমাদের কাছে নেই।
টানা বৃষ্টির কারণে হাতিরঝিলে পানি বেড়ে গেছে। ফলে গুলশান থেকে হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার গুলশানের গুদারাঘাট ওয়াটার ট্যাক্সি ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, কাউন্টারটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ঘাটে কোনো ওয়াটার ট্যাক্সি নেই। কাউন্টারের সামনে একটি নোটিস টানানো আছে, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে- পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে গুলশান কাউন্টার থেকে ওয়াটার ট্যাক্সি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
গত রোববারের বিরতিহীন বৃষ্টিতে হাতিরঝিলে পানি বেড়ে গেছে। যে কারণে গুলশানের দিক থেকে পুলিশ প্লাজার আগের ব্রিজটির নিচ দিয়ে আর ওয়াটার ট্যাক্সি চলাচলের অবস্থা নেই। ব্রিজটি ছুঁই ছুঁই হয়েছে পানি। যে কারণে গুলশান গুদারাঘাট কাউন্টার থেকে হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সি আর চলাচল করতে পারছে না। তবে পুলিশ প্লাজা, রামপুরা, এফডিসি ঘাট থেকে ওয়াটার ট্যাক্সিগুলো চলাচল করছে স্বাভাবিকভাবে।
গুলশান ঘাটের কাউন্টার কর্মী ফরিদুল ইসলাম বলেন, শুধু গুলশান ঘাট থেকেই ওয়াটার ট্যাক্সি চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। কাউন্টারও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে গুলশান ব্যতীত সব কাউন্টার থেকে ওয়াটার ট্যাক্সি চলাচল করছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিকের দেওয়া পূর্বাভাসে জানানো হয়, দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় রাজধানী ঢাকাসহ সাত বিভাগে অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। সেই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টায় খুলনা ছাড়া বাকি সব বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমবে।
তবে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমে এলে সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
বুধবার (১৫ জুলাই) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি