অপপ্রচার ও সামাজিক বিভাজন প্রতিরোধ এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ থেকে দূরে রাখাসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে ‘ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ’ নামে নতুন একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত মডেল মসজিদগুলোর প্রকল্প ব্যয়, ব্যয় বৃদ্ধি এবং নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে সোমবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।
সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে পৃথক প্রশ্নের জবাবে ধর্মবিষয়কমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তার লিখিত প্রশ্নে জানতে চান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার আংশিক এলাকায় ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সামাজিক বিভাজন প্রতিরোধে তরুণদের জন্য সচেতনতামূলক ধর্মীয় শিক্ষা ও সম্প্রীতি কার্যক্রম গ্রহণে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে।
লিখিত জবাবে ধর্মমন্ত্রী বলেন, সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার অংশবিশেষে তরুণ সমাজকে ধর্মীয় উগ্রবাদ, গুজব ও সামাজিক বিভাজন থেকে দূরে রাখতে স্থানীয় মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোকে কেন্দ্র করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে স্থানীয় আলেম, ওলামা, ইমাম ও খতিবদের সম্পৃক্ত করে জুমার খুতবা, ধর্মীয় সেমিনার ও সম্প্রীতি সভার আয়োজন করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচিতে উগ্রবাদ, গুজব ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তরুণদের সচেতন করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, বিভিন্ন ধর্মের নেতাদের অংশগ্রহণে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সম্প্রীতি সমাবেশ নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শ ও সহযোগিতায় ভবিষ্যতে এ ধরনের নৈতিক শিক্ষা ও সম্প্রীতিমূলক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন নয়, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে পুরোহিত ও সেবাইতদের প্রশিক্ষণ এবং খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে ছাত্র-যুবকদের জন্য নীতি নৈতিকতাভিত্তিক কর্মশালাও নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক নতুন একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন ফারুকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, মডেল মসজিদ নির্মাণ একটি ভালো উদ্যোগ হলেও এর ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে। মডেল মসজিদ নির্মাণে প্রকল্প ব্যয় ও প্রাক্কলন যথাযথ ছিল কি না সেটি অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন। ১৩ কোটি টাকার প্রকল্প কীভাবে ২১ কোটিতে পৌঁছাল, মোট কতটি মডেল মসজিদ নির্মাণ হয়েছে এবং প্রতিটি মসজিদে কত ব্যয় হয়েছে- এসব বিষয়ে তদন্ত পরিচালনার জন্য আজই মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেব।
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে, একই সঙ্গে ব্যয়ও কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তার নিজ নির্বাচনি এলাকার একটি মডেল মসজিদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুর্গাপুরের মডেল মসজিদের সামনে বড় একটি পুকুর থাকায় সেখানে প্রবেশ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা মসজিদটির নাম দিয়েছেন ‘দুর্গাপুরের তাজমহল’। অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে মসজিদটি কার্যকরভাবে ব্যবহারও করা যাচ্ছে না।
লাখো স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা :
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে তীব্র জনবল সংকট বিরাজ করছে। বর্তমানে অনুমোদিত পদের বিপরীতে চিকিৎসক, নার্স ও মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে। তবে এ ঘাটতি মেটাতে সরকার বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অতিদ্রুত এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, দেশের সব সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত মোট পদের সংখ্যা ৪১ হাজার ৮০৬টি। এর মধ্যে বর্তমানে ৯ হাজার ৪০৭টি চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। নার্সদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। সারা দেশে অনুমোদিত ৪৯ হাজার ৮৭৯টি নার্স পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ৪৫ হাজার ৩০২ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৪ হাজার ৫৭৭টি পদ।
মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় ঘাটতি মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে। মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট অনুমোদিত ৬৫ হাজার ২৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪৬ হাজার ২৮৩ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ১৮ হাজার ৯৪৭টি পদ।
এর মধ্যে পরিবার কল্যাণ সহকারী (এফডব্লিউএ) পদের সংখ্যা ২৩ হাজার ৫০০টি হলেও কর্মরত আছেন ১৫ হাজার ২০৭ জন। শূন্য রয়েছে ৮ হাজার ২৯৩টি পদ। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) পদের ৬ হাজার ৩৬১টির মধ্যে ৩ হাজার ১৬১টি পদ শূন্য। এ ছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) পদের ১৪ হাজার ৪৬০টির মধ্যে ৫৪০টি পদ শূন্য রয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারী (এইচএ) পদের ২০ হাজার ৯০৯টির মধ্যে শূন্য রয়েছে ৬ হাজার ৯৫৩টি পদ।
মন্ত্রী জানান, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ সরকারের একটি চলমান প্রক্রিয়া। চিকিৎসক সংকট কাটাতে ৪৫তম বিসিএসের মাধ্যমে ৪৫০ জন, ৪৬তম বিসিএসে ১ হাজার ৬৮২ জন, ৪৭তম বিসিএসে ১ হাজার ৩৩১ জন এবং ৫০তম বিসিএসের মাধ্যমে ৬৫০ জন সহকারী সার্জন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
একই সঙ্গে সিনিয়র স্টাফ নার্সের শূন্য পদ পূরণে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। দশম গ্রেডের মিডওয়াইফ পদে নিয়োগের জন্য গত ১৯ এপ্রিল চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করেছে পিএসসি। বর্তমানে নির্বাচিতদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাজ চলছে। এসব শেষ হলেই তাদের পদায়নের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে অতিদ্রুত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শূন্য পদগুলোতে জনবল পদায়ন করা হবে।
সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে মানসিক সমস্যায় আক্রান্তদের ৯২ শতাংশেরও বেশি কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন না। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮-১৯) অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। অথচ তাদের ৯২ শতাংশেরও বেশি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন না।
তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মানসিক রোগ অক্ষমতাজনিত অসুস্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা ও কর্মক্ষমতা হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ। যদিও মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে হৃদরোগ ও ক্যানসার এখনও শীর্ষে রয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার ক্ষেত্রে মানসিক রোগের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ-সুবিধা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন মাত্র ১ দশমিক ১৭ জন। সরকারি খাতে নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রায় ৩৫০ জন। এ ঘাটতি পূরণে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (ঢাকা) এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালকে দেশের প্রধান বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছে।
লালদিয়াচর টার্মিনালের চুক্তি বাতিলের পরিকল্পনা নেই :
চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়াচর কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে করা কনসেশন চুক্তি বাতিল বা পুনঃচুক্তির কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) কাঠামোর আওতায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চুক্তিটি সম্পাদন করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহনমন্ত্রী এ তথ্য জানান। মন্ত্রী বলেন, চুক্তির মেয়াদ ৩৩ বছর। এর মধ্যে তিন বছর নির্মাণকাল এবং ৩০ বছর পরিচালনাকাল। পরবর্তীতে আরও ১৫ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের খালি জায়গায় নির্মিতব্য এ টার্মিনালে ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। এর ফলে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি