স্ট্রেইট অব হরমুজ বা হরমুজ প্রণালীতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সংঘাত চরম রূপ ধারণ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ওমানি জলসীমায় দুটি ইরানি ক্রুজ মিসাইল আঘাত হেনেছে। এই ভয়াবহ হামলায় এক ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। এছাড়া আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়ে ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ইউএই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে জানিয়েছে, ওমানি জলসীমায় হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণ লেনে তাদের ‘মম্বাসা’ ও ‘আল বাহিয়া’ নামের দুটি জাতীয় ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্য করে ইরান ক্রুজ মিসাইল ছুড়েছে। এতে মম্বাসা ট্যাঙ্কারে থাকা এক ভারতীয় কর্মী প্রাণ হারান এবং আটজন আহত হন। আহতদের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় ও দুইজন ইউক্রেনীয় নাগরিক, যাদের চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইউএই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষিত রেখেছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছে, ট্যাঙ্কার দুটি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে এবং নেভিগেশন সিস্টেম বন্ধ করে মাইন বিছানো বেআইনি পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, ‘আগ্রাসী শত্রু’ যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় এই অবৈধ রুট ব্যবহার এবং তাদের সাথে সহযোগিতা করার পরিণাম হবে মারাত্মক, যার ফলে প্রণালী পুনর্খোলার কাজে বিলম্ব ঘটবে এবং বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হবে।
শুধু ওমান সাগরেই নয়, সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে অন্য আরব রাষ্ট্রগুলোতেও। মঙ্গলবার সকালে বাহরাইনে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। বাহরাইন রাজপরিবারের মিডিয়া উপদেষ্টা জানিয়েছেন, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানি আকাশযানগুলো সফলভাবে প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। তবে আইআরজিসি দাবি করেছে, তাদের হামলায় মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের এয়ার কন্ট্রোল রাডার ও প্যাট্রিয়ট রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।
একই সাথে ইরানি ড্রোন কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির যোগাযোগ ব্যবস্থা ও গোলাবারুদের ডিপো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানি সংবাদমাধ্যম। তবে মার্কিন সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স ইরানের এই ক্ষয়ক্ষতির দাবিকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এছাড়াও জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে আইআরজিসি। জর্ডানের জনগণকে তাদের দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফরাসি নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা বলে, জর্ডানের জনগণের সাথে ইরানের কোনো শত্রুতা নেই, বরং ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা অত্যাচারের অংশীদার হওয়ার হাত থেকে তাদের দেশকে রক্ষা করতেই এই আহ্বান।
অন্যদিকে, ওমানের কালহাতের উত্তর-পূর্বে অপর একটি ট্যাঙ্কারে ‘অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র’ আঘাত হেনেছে বলে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, তবে সেখানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবারই ঘোষণা দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে এবং এটি পাহারা দেওয়ার খরচ হিসেবে ২০ শতাংশ মাশুল আদায় করবে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ড হুঙ্কার দিয়ে বলেছে, এই প্রণালীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই এবং তাদের এখানে নাক গলাতে দেওয়া হবে না।
সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট