পাকা সড়ক বদলে দিয়েছে কুয়াকাটার পর্যটন শিল্প

ছগির হোসেন

সারাদেশ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এবার যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পর্যটন কেন্দ্রের পূর্ণতা পেয়েছে সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা। জিরো পয়েন্ট থেকে দর্শনীয় স্থান গঙ্গামতি,

2026-07-14T12:47:43+00:00
2026-07-14T12:49:18+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
পাকা সড়ক বদলে দিয়েছে কুয়াকাটার পর্যটন শিল্প
ছগির হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম  আপডেট: ১৪.০৭.২০২৬ ১২:৪৯ পিএম
কুয়াকাটার পাকা সড়ক। ছবি : সময়ের আলো
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এবার যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পর্যটন কেন্দ্রের পূর্ণতা পেয়েছে সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা। জিরো পয়েন্ট থেকে দর্শনীয় স্থান গঙ্গামতি, লেম্বুরবন, তিন নদীর মোহনা, ঝাউবন ও মিশ্রীপাড়া বৌদ্ধ বিহারে যেতে এখন সময় ও দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেল আগত পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এলজিইডি কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ এবং জেলা প্রশাসনের দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টায় এই পর্যটন কেন্দ্র যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

এক সময় বর্ষা মৌসুম এলেই কুয়াকাটার অন্যতম দর্শনীয় স্থান গঙ্গামতি, লেম্বুরবন, তিন নদীর মোহনা, ঝাউবন ও মিশ্রীপাড়া বৌদ্ধ বিহারে যেতে দুর্ভোগের শেষ থাকত না। কাঁচা ও কর্দমাক্ত সড়ক পাড়ি দিয়ে এসব স্থানে পৌঁছাতে ভোগান্তিতে পড়তেন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেক পর্যটকেরা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মাঝপথেই ফিরে যেতেন। যাতায়াত পথের অভাবে জিরো পয়েন্টই ছিল একমাত্র দর্শনীয় স্থান। তবে, এ বছর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) এসব দর্শনীয় স্থানে পৌঁছাতে পাকা সড়ক নির্মাণ করায় পাল্টে গেছে আগের সেই দুর্ভোগের চিত্র। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বেড়েছে পর্যটক, প্রাণ ফিরে পেয়েছে স্থানীয় পর্যটন শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে।

সড়ক নির্মাণের পর কুয়াকাটায় দর্শনার্থী বেড়েছে। ছবি : সময়ের আলো

সড়ক নির্মাণের পর কুয়াকাটায় দর্শনার্থী বেড়েছে। ছবি : সময়ের আলো


এখন এ পথ দিয়ে অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহনগুলো সহজেই চলাচল করতে পারছে। ফলে, পর্যটকরা একাধিক দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারছেন খুব সহজে। এতে তাদের সময় ও ভোগান্তি দুই-ই কমেছে।

এলজিইডি কর্তৃপক্ষ জানান, বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন প্রকল্পের আওতায় কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রের দর্শনীয় স্থান কেন্দ্রিক প্রায় ২০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পাকা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে রাস্তার কাজ শেষের পথে। পর্যটকরা এখন ওই রাস্তা দিয়ে দর্শনীয় স্থানগুলোতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করছেন।

ঢাকা থেকে সপরিবারে বেড়াতে আসা পর্যটক দম্পতি মো. মাজহারুল আনোয়ার ও রাবেয়া বসরী জানান, তারা আগে কখনও কুয়াকাটায় আসেননি। এখানে এসে এবার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তাদের ভালো লেগেছে। যাতায়াত করতে কোনো অসুবিধা হয়নি।

বগুড়া থেকে আসা পর্যটক তাসলিমা তাবাচ্ছুম বলেন, ‘আমি ৩ বছর আগে একবার কুয়াকাটায় বেড়াতে এসেছিলাম। তখন সাগরে জোয়ারের পানি কমে যাওয়ার পর লেম্বুরবন ও ঝাউবনে গিয়েছিলাম। কিন্তু বৃষ্টিতে কাদা হওয়ায়, বেড়িবাঁধ দিয়ে কোথাও যেতে পারিনি। এবার এসে দেখি রাস্তা পাকা হয়েছে, তাই কুয়াকাটার সকল দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পেরেছি।’

এ পথ দিয়ে এখন সহজেই পৌঁছানো যায় দর্শনীয় স্থানগুলোতে। ছবি : সময়ের আলো

এ পথ দিয়ে এখন সহজেই পৌঁছানো যায় দর্শনীয় স্থানগুলোতে। ছবি : সময়ের আলো


স্থানীয় উপজেলা সদর থেকে আসা দর্শনার্থী মো. কবির তালুকদার বলেন, ‘কুয়াকাটায় প্রতি সপ্তাহেই আসি। সব জায়গায় ঘোরাফেরা করি, কিন্তু আগে বর্ষা মৌসুমে কুয়াকাটায় কম আসা পড়ত। কারণ, জিরো পয়েন্ট ছাড়া তেমন কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। বর্তমানে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ কার্পেটিং করে দেওয়ায় সবসময় সব জায়গায় এখন যাওয়া যায়। তাই এখন আরও বেশি আসি।’

কুয়াকাটার মম্বিপাড়া গ্রামের মো. হারুন-অর রশিদ বলেন, ‘জন্মের পর থেকে দেখেছি, কাঁচা রাস্তা, বালুর স্তূপ আর ভাঙা বড় বড় গর্ত ছিল এই বেড়িবাঁধে এখন পাকা হওয়ার পর আমাদের সন্তানরা স্কুল-মাদরাসায় তাড়াতাড়ি যেতে পারে, আমরাও বাজারঘাটের মালামাল বেচা-বিক্রি সহজে করতে পারি।’

নতুন সড়ক শুধু পর্যটকদের সুবিধাই বাড়ায়নি। স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়েছে ইতিবাচক প্রভাব। লেম্বুরবন থেকে কাউয়ার চর পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার সৈকতের কোল ঘেঁষে রয়েছে কুয়াকাটা পৌরসভা, লতাচাপলী ও ধুলাসর ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহনসহ নানা কাজে এখন আগের তুলনায় যাতায়াত সুবিধাসহ অনেক কম সময় লাগছে। সড়ক পথের এমন উন্নয়নের কারণে পর্যটক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসিক হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ভ্রাম্যমাণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা, শামুক-ঝিনুক ও হস্তশিল্পের দোকানগুলোতে বেড়েছে বেচাকেনা।


কুয়াকাটার সিকুইন হোটেল মালিক মো. জাহাঙ্গীর হাওলাদার বলেন, ‘আগে অনেক পর্যটক শুধু সৈকত দেখে ফিরে যেতেন। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ার কারণে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরতে পারায় পর্যটকরা একদিনের বদলে ৩ দিন অবস্থান করছেন। এতে আমাদের হোটেল ব্যবসাও ভালো হচ্ছে।’

রেস্তোরাঁ মালিক মো. আলমগীর হোসেন জানান, রাস্তা হওয়ার পর পর্যটকরা সব জায়গায় যেতে পারে। তাই পর্যটক দিন দিন বাড়ছে। সেইসঙ্গে আগের তুলনায় রেস্তোরাঁয় বিক্রিও বাড়ছে।

মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহার মার্কেটের শামুক-ঝিনুকের দোকান মালিক মো. জসিম উদ্দিন মুসুল্লী জানান, কুয়াকাটা থেকে মিশ্রিপাড়া প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরত্ব। এত বছর রাস্তা খারাপ থাকায় শুধুমাত্র শীতের মৌসুমে পর্যটকরা এখানে আসত। আমাদের বেচা-কেনাও কম হতো। এবার রাস্তা হওয়ায় পর্যটকরা দিন রাত সবসময় এখানে আসে। আমাদের বিক্রিও আগের তুলনায় বেশি হয়।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নই একটি পর্যটন শিল্প বিকাশের মূল চাবিকাঠি। যাতায়াত ব্যবস্থা যত উন্নত হবে, পর্যটন কেন্দ্রের উন্নয়ন ও পর্যটকও তত বাড়বে। তবে, সড়কের পাশাপাশি প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে আধুনিক সাইনেজ, পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পর্যটনবান্ধব সুবিধা নিশ্চিত করা হলে কুয়াকাটার পর্যটন শিল্প আরও পরিপূর্ণতা লাভ করবে। পাশাপাশি, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান ও অর্থনৈতিক কাজের গতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনসহ দেশের অন্যতম আধুনিক ও টেকসই পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে সমুদ্র সৈকত পর্যটন নগরী কুয়াকাটা।


কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও কুয়াকাটা গেস্ট হাউজ মালিক আবদুল মোতালেব শরীফ জানান, কুয়াকাটায় পর্যটকদের আনাগোনা আগের চেয়ে বেড়েছে। এতদিন যে সকল দর্শনীয় জায়গায় যেতে পর্যটকদের বিড়ম্বনা ছিল, তা কেটে গেছে। এখন পথ সুগম হয়েছে। যাওয়া আসা করতে বর্ষা মৌসুমেও পর্যটকদের ঝামেলা পোহাতে হয় না।

কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াছিন ছাদেক জানান, কুয়াকাটায় যে দর্শনীয় জায়গাগুলো রয়েছে সেগুলোর কথা বলতে গেলে অবশ্যই গঙ্গামতি, লেম্বুরবন, মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহার, মিনি সুইজারল্যান্ড এবং লাল কাঁকড়ার চরের কথা বলতে হবে। বর্তমানে এলজিইডি ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে কার্পেটি রাস্তা করা হয়েছে। পর্যটকরা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারছে এসব জায়গায়। তাই এগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। 

এলজিইডির কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কুয়াকাটায় আগত পর্যটকরা যাতে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এসব সড়ক উন্নয়ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও পর্যটকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য পর্যায়ক্রমে আমাদের আরও অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

পর্যটন নগরী কুয়াকাটাকে পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তুলতে হলে নিতে হবে আরও ব্যাপক উন্নয়নমুখী প্রকল্পের কাজ। দর্শনীয় স্থানগুলোতে রাখতে হবে টয়লেট, বিশ্রামাগারসহ পর্যটকদের পছন্দনীয় ও আরামদায় ব্যবস্থা। তবেই সাগরকন্যা কুয়াকাটা পর্যটন বিকাশে পরিপূর্ণতা লাভ করবে এমন প্রত্যাশা সকলের। 

সময়ের আলো/মহু





  বিষয়:   সড়ক  কুয়াকাটা  পর্যটন  শিল্প  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: