মাত্র মাসখানেক আগের কথা। বুকে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে একটি সবুজ রঙের টিনশেড দোকান দিয়েছিলেন মফিজুর রহমান। বয়স ৬২ পেরিয়েছে, তবু জীবনের শেষভাগে এসে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু গত ৬ জুলাইয়ের প্রলয়ংকরী বন্যা তার সেই স্বপ্নকে এক নিমেষেই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। দোকান ডুবেছে, নষ্ট হয়েছে মালামাল। শেষ সম্বল যা একটু বাঁচাতে পেরেছিলেন, তা নিয়েই এখন আশ্রয় নিয়েছেন কাছের একটি ব্রিজে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) নির্মিত ওই ব্রিজটি পানি থেকে মাত্র চার ফুট উঁচুতে অবস্থিত। আর এই চার ফুট জায়গাই এখন মফিজুরের পুরো পৃথিবী। পলিথিন আর বাঁশ দিয়ে কোনোমতে একটি তাঁবু খাটিয়েছেন তিনি। তার নিচেই সাজিয়ে বসেছেন বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যৎসামান্য মালামালের পসরা।
সোমবার (১৩ জুলাই) বাঁশখালীর কাথরিয়া ইউনিয়নের মধ্যম মানিকপাঠান গ্রামে গিয়ে দেখা মেলে জীবনযুদ্ধে লড়াকু এই বৃদ্ধের। ক্লান্তি ও হতাশা মেশানো কণ্ঠে মফিজুর বলেন, চার দিন আগে তাঁবু টাঙিয়ে এই ব্রিজের ওপর অস্থায়ী দোকান বসিয়েছি। আমার ৬২ বছরের জীবনে এত ভয়াবহ বন্যা আর কখনো দেখিনি।
মফিজুরের এই করুণ গল্প আসলে কোনো একক ঘটনা নয়, এটি এখন পুরো বাঁশখালীর হাজারো মানুষের প্রতিচ্ছবি। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ দ্রুত বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীর ওপর দিয়ে।
৬ জুলাই থেকে উপজেলার বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, কাথরিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক ইউনিয়নের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকাই এখন পানির নিচে।
মধ্যম মানিকপাঠান গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে এক বিষাদময় দৃশ্য। চারদিকে শুধু থইথই ঘোলা পানি। ফসলি জমি, রাস্তাঘাট সব বিলীন। কোথাও কোথাও শুধু কলাগাছের মাথা উঁকি দিচ্ছে, আবার কোথাও টিনের চালা ছুঁইছুঁই করছে বন্যার পানি। মফিজুরের স্বপ্নের সেই সবুজ টিনশেড দোকানটিও এখন পানির নিচে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত।
বন্যার এই আকস্মিক ও তীব্র আঘাত মফিজুর রহমানকে নিঃস্ব করলেও তার মনোবল ভাঙতে পারেনি। ব্রিজের ওপর প্লাস্টিকের তাঁবু খাটিয়ে দিনের পর দিন বসে থাকা— এটাই যেন প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের বিরুদ্ধে তার নীরব প্রতিরোধ। জীবনের উপার্জিত সঞ্চয়, নতুন দোকানের স্বপ্ন আর মাসখানেকের হাড়ভাঙা পরিশ্রম সব হারিয়েও তিনি টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন।
সব বন্যাই একসময় শেষ হয়, পানিও একসময় নেমে যাবে। কিন্তু মফিজুরের এই অপূরণীয় ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে উঠবে, কিংবা তার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন আদৌ সত্যি হবে কি না— সেই উত্তর আপাতত বন্যার ঘোলা জলের নিচেই চাপা পড়ে রয়েছে।
সময়ের আলো/জোই