শিল্পবর্জ্যে বিপর্যস্ত গাজিখালি নদী, ঝুঁকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি

সারাদেশ

ঢাকার ধামরাই উপজেলার গাংগুটিয়া ইউনিয়নের বাড়বাড়িয়া এলাকায় অবস্থিত ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গাজিখালি নদীতে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ফেলার অভিযোগ

2026-07-16T15:15:04+00:00
2026-07-16T15:16:09+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬,
১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
শিল্পবর্জ্যে বিপর্যস্ত গাজিখালি নদী, ঝুঁকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য
ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ৩:১৫ পিএম  আপডেট: ১৬.০৭.২০২৬ ৩:১৬ পিএম
ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের শিল্পবর্জ্যে বিপর্যস্ত গাজিখালি নদী। ছবি : সময়ের আলো
ঢাকার ধামরাই উপজেলার গাংগুটিয়া ইউনিয়নের বাড়বাড়িয়া এলাকায় অবস্থিত ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গাজিখালি নদীতে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ফেলার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

তাদের দাবি, কারখানা থেকে নির্গত রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্যে নদীর পানি কালচে হয়ে গেছে। মারা যাচ্ছে দেশীয় মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী। নদীর তীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ। এতে পরিবেশের পাশাপাশি স্থানীয় জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় দেশীয় মাছ ও নানা ধরনের জলজ প্রাণীতে সমৃদ্ধ ছিল গাজিখালি নদী। তবে, বছরের পর বছর ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালসের অপরিশোধিত কিংবা আংশিক শোধিত রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণে নদীটি ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ভারী বর্ষণের সময় পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে, সেই সুযোগে বিপুল পরিমাণ তরল বর্জ্য নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাদের।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর বিভিন্ন অংশের পানি কালচে রঙ ধারণ করেছে। পানির ওপর ভেসে রয়েছে অসংখ্য মৃত মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। কোথাও কোথাও কারখানা থেকে নির্গত পানির সঙ্গে তৈরি হয়েছে বড় বড় ফেনা ও বুদবুদ। নদীর তীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ।

ভেসে ওঠা মৃত মাছ। ছবি : সময়ের আলো

ভেসে ওঠা মৃত মাছ। ছবি : সময়ের আলো


স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগেও এই নদীতে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও, এখন মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। দূষণের কারণে কৃষিকাজ কিংবা গবাদিপশুর জন্যও নদীর পানি ব্যবহার করতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে।

স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল রানা বলেন, ‘কারখানার বর্জ্যের কারণে শুধু নদী নয়, আশপাশের পুরো পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দুর্গন্ধ, দূষিত পানি ও রাসায়নিকের প্রভাবে শিশু, বৃদ্ধসহ স্থানীয় মানুষ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও, এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদফতরের নির্দেশনা অনুযায়ী কারখানাটিতে বর্জ্য শোধনাগার থাকলেও, সেটি সবসময় কার্যকরভাবে পরিচালিত হয় না। ফলে, অপরিশোধিত কিংবা আংশিক শোধিত শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে।

ভুক্তভোগী আবুল হোসেন বলেন, ‘এত বড় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের, পরিবেশের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা পরিবেশগত দায়বদ্ধতার প্রতি উদাসীন। মানুষের স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার চেয়ে তাদের কাছে লাভই বড়। স্থানীয়দের বা পরিবেশের এমন ক্ষতির কথা বলা হলেও, কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না।’


বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদফতরের নির্ধারিত মান অতিক্রম করে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত বা দূষিত তরল বর্জ্য নদী, খাল, জলাশয় কিংবা উন্মুক্ত স্থানে ফেলতে পারে না। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকে উচ্চমাত্রার দূষণকারী বা ‘রেড ক্যাটাগরি’ শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন এবং তা সার্বক্ষণিক সচল রাখা বাধ্যতামূলক। আইন অনুযায়ী এসব বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে জরিমানা, ক্ষতিপূরণ আদায়, কার্যক্রম স্থগিত কিংবা কারখানা বন্ধসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায় না।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের রাসায়নিক বর্জ্যে থাকা বিভিন্ন বিষাক্ত উপাদান নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। এর ফলে মাছ, শামুক, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে এবং জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই দূষণ কৃষিজমি, ভূগর্ভস্থ পানি এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ইনচার্জ মো. জাহিদ বলেন, ‘এটা তো নতুন কিছু না। এরকম অনেক হয়, সাংবাদিকেরা আসে, বলে যায়। বিভিন্ন ধরনের খবর হয়। আমরা এটা নিয়ে এতটা কেয়ার করি না। ইনসেপ্টা নিয়মিতই এরকম করে।’

ধামরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আল মামুন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি একটু আগেই তথ্য পেয়েছি এবং গতকাল রাতে একটি ভিডিও পেয়েছিলাম। আমি ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদফতরের ডিডি ও এডি যারা আছেন, তাদের বিষয়টি জানিয়েছি। কোনো প্রতিষ্ঠান ইটিপির বাইরে থাকার সুযোগ নেই। খুব দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   শিল্পবর্জ্য  বিপর্যস্ত  গাজিখালি  নদী  ঝুঁকি  পরিবেশ  জনস্বাস্থ্য  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: