লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে জারিরদোনা শাখা খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদার, স্থানীয় যুবদল নেতা ও এলজিইডি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ টাকার একটি সরকারি প্রকল্প মাত্র ১০ লাখ টাকায় নামমাত্র সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। এলাকাবাসীর ভাষায়, জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে এটা সাধারণ অনিয়ম নয়, এ যেন এক ‘সাগর চুরি’।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে কমলনগর উপজেলার জারিরদোনা শাখা খালের ৫.৬৯ কিলোমিটার পুনঃখননের দরপত্র আহ্বান করা হয়। মেসার্স নীলিমা ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান ১ কোটি ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা চুক্তিতে কাজটি পায়।
নকশা অনুযায়ী খালের উপরিভাগে ১৫ মিটার, তলদেশে ২.৫ মিটার প্রস্থ ও ১০ মিটার গভীরতা নিশ্চিত করার কথা ছিল। এছাড়া খালের বিভিন্ন স্পটে ১৩টি রেফারেন্স বেড ব্লক ও ২৬টি টিবিএম নির্মাণের বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে সরেজমিনে গভীরতা ও প্রস্থের কোনো নিয়ম মানতে দেখা যায়নি; অনেক জায়গায় খালের বদলে কেবল নালার মতো করে মাটি কাটা হয়েছে। এমনকি নকশানুযায়ী কোনো বেড ব্লক বা টিবিএম-এর অস্তিত্বও মেলেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল ঠিকাদার ও রামগতি পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি অপরূপ দাস কাজটি করার জন্য স্থানীয় যুবদলের কয়েকজন নেতার কাছে ২৩ লাখ টাকার বিনিময়ে সাব-কনট্রাক্ট হিসেবে বিক্রি করে দেন। পরবর্তীতে ওই যুবদল নেতারা কোনো শ্রমিক ব্যবহার না করে মাত্র ১০ লাখ টাকা চুক্তিতে এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে দায়সারাভাবে খননকাজ শেষ করেন।
প্রকল্পের শর্তানুযায়ী ৩০ শতাংশ শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা সম্পূর্ণ অমান্য করা হয়েছে। খালের দুই পাড়ের অবৈধ দোকানপাট অপসারণ না করে, আর্থিক সুবিধা নিয়ে কেবল মাঝখান থেকে নামমাত্র মাটি কাটা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি একটি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ছিল। কিন্তু ঠিকাদার ও যুবদল নেতারা এলজিইডির অফিসারদের সাথে যোগসাজশ করে পুরো টাকাটাই লোপাট করেছে। আমরা এই চুরির সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
প্রকল্প তদারকির দায়িত্বে থাকা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী ছিদ্দিকী প্রকল্পে ম্যানুয়াল লেবার বা শ্রমিক ব্যবহার না করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে ভেকু দিয়ে করা কাজকে তিনি ‘ঠিকঠাক’ দাবি করেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে পুরো বিল উত্তোলন করে নিলেও রেফারেন্স বেড ব্লক ও টিবিএমের অনুপস্থিতি নিয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এই কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, কমলনগর উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদ অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কোটি টাকার এই প্রকল্পে এমন হরিলুটের কারণে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসনের পরিবর্তে উল্টো খালের পাড় ধসে ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা অবিলম্বে এই দুর্নীতির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
সময়ের আলো/জেডি