শিক্ষককে উপহার তুলে দিচ্ছেন এক শিক্ষার্থী। ছবি : সময়ের আলো
টানা ৩৯ বছর একই প্রাঙ্গণে কাটিয়েছেন। হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে পরম মমতায় মানুষ করেছেন। অবশেষে সেই প্রিয় আঙিনা ছেড়ে যাওয়ার বেলায় রাজকীয় সম্মানে সিক্ত হলেন পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার বড় দলুয়াগছ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরীশ চন্দ্র রায়।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) অবসরে যাওয়ার দিনে ফুলে সজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেয় সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।
১৯৮৮ সালে এই বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন হরীশ চন্দ্র রায়। দীর্ঘ ৩৯ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কখনও শিক্ষক, কখনও অভিভাবক, আবার কখনও পথপ্রদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৬ জুলাই তার এই দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানের জনক।
বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনায় অত্যন্ত আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বহু প্রাক্তন শিক্ষার্থীও তাদের প্রিয় শিক্ষককে একনজর দেখতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন। অনুষ্ঠানে হরীশ চন্দ্র রায়কে ফুলেল শুভেচ্ছা, উত্তরীয় এবং সম্মাননা স্মারকসহ নানা উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী ও সহকর্মীর অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাবুল হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মামুনুর রশীদ, মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও এমপির প্রতিনিধি হারুণ অর রশিদ এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মকবুলার রহমান।
এছাড়াও, প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক আকরাম হোসেন জাকারিয়া, কেরামত উল্লাহ, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মিজানুর রহমানসহ অনেকে বক্তব্য রাখেন। এ সময় বিভিন্ন স্কুল এবং ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও অভিভাবকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, হরীশ চন্দ্র রায় শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ। ৩৯ বছর একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তিনি যে সততা, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
হরীশ চন্দ্র রায় তার বিদায়ী বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘এই স্কুলটিই ছিল আমার ঘর-সংসার। ৩৯ বছর এই শিশুদের মাঝেই আমি আমার জীবন খুঁজে পেয়েছি। আজ বিদায় নিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমার মনটা এই প্রাঙ্গণেই পড়ে থাকবে।’
অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয় মূল আকর্ষণ। বিদায়ী এই গুণী শিক্ষককে রাজকীয় ও সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে বসানো হয়। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে শোভাযাত্রা করে তাকে পৌঁছে দেওয়া হয় নিজ বাড়িতে। যাত্রাপথে রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ ও খুদে শিক্ষার্থীরা প্রিয় শিক্ষককে হাত নেড়ে ও ফুল ছিটিয়ে শেষ বিদায় জানান। এ সময় আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
তেঁতুলিয়ার প্রান্তিক জনপদে একজন শিক্ষকের প্রতি সর্বস্তরের মানুষের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের ঘটনাটি দীর্ঘকাল মানুষের মনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।