নিলামে উঠছে ডিয়েগো ম্যারাডোনার স্মৃতিবিজড়িত ‘হ্যান্ড অব গড’ বলটি। গত কয়েক বছরে স্মারক ও সংগ্রহযোগ্য পণ্যের বাজার যেভাবে চাঙ্গা হয়েছে, তাতে ফুটবল ইতিহাসের সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি গোল করার পেছনে যে বলটি ভূমিকা রেখেছিল, তার জন্য কেউ কত টাকা গুনতে রাজি হতে পারেন?
উত্তরটা হতে পারে- ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটি ডলার!
অন্তত হেরিটেজ অকশনস-এর ধারণা এমনটাই। ১৯৮৬ সালের ২২ জুনের সেই ম্যাচে ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অব গড' এবং 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি'—উভয় গোলের সময় ব্যবহৃত সাদা-কালো রঙের 'অফিসিয়াল ওয়ার্ল্ড কাপ বল ১৯৮৬' নামের চুপসে যাওয়া এই বলটির আনুমানিক মূল্য এমনই নির্ধারণ করেছে তারা। চলতি মাসের শেষ দিকে হেরিটেজে বলটির নিলাম শুরু হবে, যা শেষ হবে আগামী ২১ থেকে ২৩ আগস্টের ছুটির দিনগুলোতে।
হেরিটেজের প্রোডাকশন ম্যানেজার মাইক প্রোভেনজেল বলেন, এখানে আমার ২০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতায় এমন অনেক জিনিস আসতে দেখেছি, যা আসার পর পুরো বিভাগের কাজ থমকে গিয়েছিল। এই বলটি নিশ্চিতভাবেই সেই তালিকার একটি। এটি এতটাই আইকনিক যে ফুটবল সম্পর্কে একদমই ধারণা নেই এমন মানুষও এর পেছনের মূল্য বুঝতে পারবেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বলটি যে এবারই প্রথম নিলামে উঠছে, তা কিন্তু নয়।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে 'গোল্ডিন'-এর মাধ্যমে বলটির জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ ৪০ হাজার ডলারের দরপ্রস্তাব জমা পড়েছিল। তবে বিক্রেতার কাঙ্ক্ষিত মূল্য স্পর্শ না করায় সেবার বলটি বিক্রি হয়নি। হেরিটেজের এবারের নিলামেও একটি 'গোপন নূন্যতম মূল্য' নির্ধারণ করা আছে, যা বলটির গুরুত্ব বিবেচনা করে বেশ পরিমিত বলেই মনে করছে নিলামকারী প্রতিষ্ঠানটি।
প্রোভেনজেল বলেন, আমরা এই দামের অনুমানটি করেছি ওই ম্যাচে ম্যারাডোনার পরা জার্সির মূল্যের ওপর ভিত্তি করে। আমাদের ধারণা, এটির মূল্য জার্সির কাছাকাছি হবে, এমনকি বেশিও হতে পারে। কারণ এটিই সেই আসল বল, যা দুবার জালের ভেতর প্রবেশ করেছিল।
আর্জেন্টিনার চার কোটি মানুষের কাছে এই বলটি অমূল্য। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও আইকনিক দুটি মুহূর্তের সাক্ষী ছিল এই বল।
১৯৮৬ সালে মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত সেই গোলটি হয়েছিল। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তাপ মাথায় নিয়ে সেদিন মাঠের লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধের খেলার ষষ্ঠ মিনিটে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে ফাঁকি দিয়ে শূন্যে ভেসে আসা বল নিজের বাঁ হাত দিয়ে জালে ঠেলে দেন ম্যারাডোনা। রেফারি সেই হ্যান্ডবল দেখতে পাননি, ফলে গোলটি বহাল থাকে। ইংল্যান্ডের ক্ষতকে আরও গভীর করে দিয়ে এর ঠিক চার মিনিট পর ম্যারাডোনা এমন এক অসাধারণ কাণ্ড ঘটালেন, যা অবিশ্বাস্য। নিজেদের অর্ধে বল পেয়ে একক নৈপুণ্যে প্রায় ৬০ মিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পথে একে একে ছয়জন ইংলিশ খেলোয়াড়কে ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। পরবর্তীতে ফিফা এটিকে 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জয়ী হয় এবং ম্যারাডোনা অধিনায়ক হিসেবে আর্জেন্টিনাকে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দেন। বহু বছর পর ম্যারাডোনা স্বীকার করেছিলেন যে প্রথম গোলটি বাতিল হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু ততক্ষণে এটি ফুটবল রূপকথার অংশ হয়ে গেছে।
ঐতিহাসিক বলটি প্রথম নিজের জিম্মায় নিয়েছিলেন আলীর বিন নাসের, যিনি তিউনিসিয়ার রেফারি হিসেবে ওই আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচটি পরিচালনা করেছিলেন। ২০২৩ সালে গোল্ডিন-এর নিলাম বিবরণীতে বিন নাসেরের একটি চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা রয়েছে, যেকোনো সেন্ট্রাল রেফারি যিনি বিশ্বকাপের একটি অফিসিয়াল ম্যাচ পরিচালনা করেন, ম্যাচ শেষে সেই বলটির একমাত্র এবং একচেটিয়া মালিকানা লাভ করেন তিনি। এই বলটি পুরো ম্যাচ জুড়েই ব্যবহৃত হয়েছিল এবং কোনো বিকল্প বল ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েনি।
তৎকালীন সময়ে এই নিয়মটি কতটা কার্যকর ছিল তা নিশ্চিত না হলেও, ২০১৪ সালে ফিফার একজন মুখপাত্র দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছিলেন যে, বিশ্বকাপের ম্যাচের বলগুলো সাধারণত দল, রেফারি, আয়োজক শহর, ফিফার অংশীদার এবং ফিফা মিউজিয়ামের জন্য স্মারক' হিসেবে বিতরণ করা হয়।
প্রোভেনজেল জানান, পরবর্তীতে কোনো এক সময়ে কোনো এক ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে বলটি কিনে নেন।
প্রোভেনজেল আরও বলেন, (বলটির বিক্রেতা) প্রযুক্তির উন্নতির জন্য অপেক্ষা করছিলেন যাতে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে এর সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত করা যায়। অবশেষে এটি 'হ্যান্ড অব গড' গোলের বল হিসেবে প্রমাণিত হয়। এরপর আরও যাচাই-বাছাইয়ের পর এটি 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি'র বল হিসেবেও প্রমাণিত হয়। যেহেতু বিশ্বকাপ চলছে এবং অতীতে আমাদের হাত ধরে এই ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় জিনিস বিক্রির দারুণ রেকর্ড রয়েছে, তাই আমরা বিশ্বকাপের এই সময়েই এটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
বলটি বর্তমানে চুপসে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রোভেনজেল বলেন, সময়ের সাথে সাথে প্রাকৃতিকভাবেই এর ভেতরের বাতাস বের হয়ে গেছে। এটিই আসলে এর মূল্যের প্রমাণ দেয়। এটি যদি সাধারণ ১ হাজার ডলারের কোনো ফুটবল হতো, তবে আমি নিশ্চিত কেউ না কেউ ভেতরের ব্লাডারটি ঠিক করে ফেলত। ব্লাডারটি ফুটো হয়ে গেছে। তবে যার কাছে এটি ছিল, তিনি এর মূল্য জানতেন। মাত্র ১০০ ডলার খরচ করলেই এটি ঠিক করা সম্ভব।
সময়ের আলো/জেডআই