ফুটবলে গোলকিপারের সেরা ম্যাচও অনেক সময় পরাজয়ের গল্প হয়ে যায়। জর্ডান পিকফোর্ডও সেই নির্মম বাস্তবতার শিকার। একের পর এক দুর্দান্ত সেভে আর্জেন্টিনার আক্রমণ ঠেকিয়ে ম্যাচে ইংল্যান্ডকে টিকিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু সামনে হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহামরা নিজেদের সামর্থ্যরে প্রতিফলন ঘটাতে না পারায় শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনাল হার নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে থ্রি লায়ন্সদের। ফলে অসাধারণ পারফরম্যান্সও পরিণত হয়েছে এক ট্র্যাজিক অধ্যায়ে।
গতকাল আটলান্টায় ২০২৬ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড। ম্যাচের আগেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের ইতিহাস, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র স্মৃতি। সেই ঐতিহাসিক উত্তাপেরই প্রতিফলন দেখা যায় ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিট থেকেই। একের পর এক ফাউল, কঠিন ট্যাকল ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে ফুটবলের চেয়ে লড়াইটাই যেন বেশি চোখে পড়ছিল। প্রথমার্ধে শারীরিক লড়াই হলেও গোলমুখী ছিল না কেউ।
ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় পিকফোর্ডের আসল পরীক্ষা। আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ দৃঢ় হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। দ্বিতীয়ার্ধজুড়ে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড, এনজো ফার্নান্দেজের জোরালো শটসহ একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে ইংল্যান্ডকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন তিনি। ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন। কিন্তু সেমিফাইনালের মতো বড় মঞ্চে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন তিনি। বলের জোগান পেলেও গোলমুখে পরিচিত ধার দেখা যায়নি। যে কয়েকটি সুযোগ পেয়েছিলেন, সেগুলোও কাজে লাগাতে পারেননি। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চাপে ফেলার বদলে বেশিরভাগ সময়ই ছিলেন বিচ্ছিন্ন।
অন্যদিকে জুড বেলিংহামের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত প্রভাব মেলেনি। মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ তৈরি কিংবা শেষ তৃতীয়াংশে সৃজনশীল পাস। কোনো দিকেই নিজের স্বাভাবিক ছাপ রাখতে পারেননি তিনি। আর্জেন্টিনার নিবিড় মার্কিংয়ে বারবার আটকে গেছেন, ফলে ইংল্যান্ডের আক্রমণও হারিয়েছে ধার ও ছন্দ। প্রায় পুরো ম্যাচজুড়ে ইংল্যান্ডকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রেখেছিলেন জর্ডান পিকফোর্ড। তবে শেষ দিকে মেসি ডান প্রান্তের মাপা ক্রস থেকে লাওতারো মার্টিনেজের নিখুঁত ফিনিশিংয়ের সামনে আর কিছুই করার ছিল না তার। এতক্ষণ যিনি একাই ইংল্যান্ডকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, শেষ দৃশ্যে তাকেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অসহায়ের মতো। শেষ পর্যন্ত সেই গোলই ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে দেয়।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই পিকফোর্ডের মুখে ফুটে ওঠে নির্মম হতাশা। মাথা নিচু করে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দৃশ্য যেন ইংল্যান্ডের পুরো অভিযানের প্রতিচ্ছবি। একের পর এক দুর্দান্ত সেভ, অসাধারণ লড়াই। সবকিছুই শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায় সতীর্থদের ব্যর্থতা আর একটি গোলের আড়ালে। সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া ইংল্যান্ডের গল্পে তাই সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়েও সবচেয়ে বেদনাদায়ক চরিত্র হয়ে থাকলেন জর্ডান পিকফোর্ড।
গোলকিপারের কাজ দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখা, একা ম্যাচ জেতানো নয়। পিকফোর্ড নিজের দায়িত্ব শতভাগ পালন করেছিলেন। কিন্তু সামনে যখন কেইন ও বেলিংহামরা নিজেদের সেরা খেলাটা উপহার দিতে পারেননি, তখন শত সেভও ইতিহাস বদলাতে পারেনি। তাই এই সেমিফাইনাল শুধু ইংল্যান্ডের বিদায়ের গল্প নয়, এটি এমন এক গোলকিপারের গল্প, যিনি সবকিছু করেও শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের নায়ক হয়ে রইলেন।
সময়ের আলো/আআ