বিশ্বের অন্যতম সেরা ঘরোয়া লিগ, বিপুল অর্থায়ন এবং অসাধারণ প্রতিভার ভান্ডার থাকার পরও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ইংল্যান্ডের ধারাবাহিক ব্যর্থতা দেশটির সমর্থকদের জন্য দীর্ঘদিনের হতাশার কারণ। ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা রাগবি প্রায় সব খেলাতেই ইংল্যান্ড বারবার শিরোপার খুব কাছে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
প্রতিবারই শোনা যায় পরিচিত সেই বক্তব্য, ‘এখনও অনেক কিছু উন্নতির সুযোগ আছে, তবে দল যেভাবে খেলেছে তাতে আমি গর্বিত।’ কিন্তু সমর্থকদের চাওয়া বিশ্বজয়ের সেই মুহূর্ত আর আসে না। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায় এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন ইংল্যান্ড ট্রফিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে না?
ক্রীড়া অবকাঠামোর দিক থেকে ইংল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম সেরা দেশ। প্রিমিয়ার লিগ, ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড এবং রাগবি ফুটবল ইউনিয়ন সবই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রীড়া সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপুল অর্থ কি সত্যিই আন্তর্জাতিক সাফল্যে রূপ নিচ্ছে?
প্রতি বছর প্রিমিয়ার লিগ প্রায় ৬ বিলিয়ন পাউন্ড আয় করে। এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয় তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে অভিজাত খেলোয়াড় তৈরিতে। তবু ইংল্যান্ডের একমাত্র বড় আন্তর্জাতিক ফুটবল শিরোপা আজও ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ। গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে ইংল্যান্ড অবশ্য উল্লেখযোগ্য উন্নতি করে। তার অধীনে ২০১৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল এবং ইউরো ২০২০ ও ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালে পৌঁছালেও শেষ ধাপেই হোঁচট খেয়েছে দলটি।
দীর্ঘদিন ধরেই ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলো কৌশলগতভাবে বেশ রক্ষণশীল। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে তারা প্রায়ই ব্যর্থ হয়। ফুটবলে ইংল্যান্ড ঐতিহ্যগতভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও বাস্তববাদী কৌশল অনুসরণ করে, যেখানে স্পেন, জার্মানি কিংবা ব্রাজিলের মতো দলগুলো প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় অনেক এগিয়ে।
সাউথগেট থেকে টমাস টুখেল কিন্তু টুর্নামেন্ট পারফরম্যান্স উন্নত করলেও ম্যাচ চলাকালে কৌশল বদলানো কিংবা সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষ করে নকআউট ম্যাচ, ফাইনাল কিংবা টাইব্রেকারে তাদের ব্যর্থতা বহুবার দেখা গেছে। ফুটবলে ইউরো ১৯৯৬, বিশ্বকাপ ১৯৯৮, ইউরো ২০০৪, বিশ্বকাপ ২০০৬, ইউরো ২০১২ এবং ইউরো ২০২০-এর পেনাল্টি শুটআউট ব্যর্থতা প্রমাণ করে চরম চাপের মুহূর্তে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মানসিক বাধা এখনও কাটেনি। তা হলে কি এর পেছনে ইংরেজদের তুলনামূলক সংযত ও ভদ্র সংস্কৃতি দায়ী? যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘যেকোনো মূল্যে জয়’ মানসিকতা কিংবা নিউজিল্যান্ডের রাগবি দল ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের অবিচল আত্মবিশ্বাস তাদের প্রতিটি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিশ্বাস জোগায়।
বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ঘরোয়া লিগ থাকা মানেই আন্তর্জাতিক সাফল্য নিশ্চিত নয়। প্রিমিয়ার লিগ বিশ্বের সেরা ফুটবল লিগ হলেও এর বড় শক্তি আসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেরা খেলোয়াড়দের উপস্থিতি থেকে। অনেক সময় এর ফলে স্থানীয় ইংলিশ খেলোয়াড়রা ক্লাবে মূল চরিত্রের বদলে সহায়ক ভূমিকায় থেকে যায়, যা জাতীয় দলে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাকে সীমিত করে। বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগে মাত্র দুজন ইংলিশ কোচ দায়িত্বে আছেন। অথচ ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে, প্রিমিয়ার লিগের প্রথম আসরে, একজন ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন ব্রিটিশ কোচ।
ইংল্যান্ড এখনও বিশ্বমানের অসংখ্য খেলোয়াড় তৈরি করছে এবং অভিজাত ক্রীড়া উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করছে। কিন্তু মানসিক দুর্বলতা, কৌশলগত অনমনীয়তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিজেদের সেরা খেলাটা খেলতে না পারার প্রবণতা এখনও রয়ে গেছে।
যতদিন না ইংল্যান্ড ‘প্রায় সফল’ দলের তকমা ঝেড়ে ফেলে এবং সেমিফাইনাল বা ফাইনালে উঠেই সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা বদলায়, ততদিন বিশ্বের অন্যতম ধনী ও সুশৃঙ্খল ক্রীড়া ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে অপূর্ণ সম্ভাবনার প্রতীক হয়েই থাকবে।
সময়ের আলো/আআ