জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) মেডিকেল সেন্টারে ১৯ হাজার ৫৬৭টি ওষুধের হিসাব মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ৩০ জুন থেকে ২১ জুলাইয়ের মধ্যে এসব ওষুধের গরমিল ধরা পড়ে। নিখোঁজ ওষুধগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৭৩ হাজার ১১০ টাকা।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের (প্রশাসন) নির্দেশে পরিচালিত আকস্মিক যাচাই-বাছাই শেষে বিষয়টি জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদক এবং ওষুধ ক্রয় কমিটির সদস্য হুসনে মোবারক।
যাচাইয়ে দেখা যায়, হিসাবের সঙ্গে মিলছে না Alatrol ৪ হাজার ৬৪৫টি, Azithromycin ৯১২টি, Ciprocin ৪২০টি, Paracetamol ৫০০০টি, Tiemonium ৭০০টি, Famotidine ২ হাজার ৫০০টি, Antanil ২০০টি, Napro ৯৯০টি এবং Domperidone ৪ হাজার ২০০টি।
হুসনে মোবারক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছিলেন যে, মেডিকেল সেন্টারে সর্দি, জ্বর ও ঠান্ডাজনিত রোগের প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ গত ৩০ জুন প্রায় দুই লাখ টাকার ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছিল, যা অন্তত এক মাস চলার কথা ছিল।’
হুসনে মোবারক জানান, মেডিকেল অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি, কমিটির সদস্য ড. সালেকুল ইসলাম এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার ফখরুল ইসলাম ওষুধের হিসাব যাচাই করতে গিয়ে প্রথমে অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধে প্রায় ৫ হাজার পিসের গরমিল পান। পরে স্টোরে সংরক্ষিত ওষুধ ও ফার্মেসিতে সরবরাহের হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, গত ২১ দিনে মোট ১৯ হাজার ৫৬৭টি ওষুধের কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা এটিকে বড় ধরনের অনিয়ম বা পুকুরচুরি বলে ধারণা করছি। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি। উপাচার্য বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন হবে বলে আশা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু ওষুধ নয়, মেডিকেল সেন্টারের অ্যাম্বুলেন্স সেবা, ল্যাব টেস্টসহ অন্যান্য খাতেও কোনো ধরনের অনিয়ম বা কারচুপি হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ মেডিকেল অফিসার (সিএমও) ডা. মোহাম্মদ শামসুর রহমান বলেন, ‘ওষুধ গ্রহণ, সংরক্ষণ ও বিতরণের পুরো প্রক্রিয়া নির্ধারিত নিয়মে পরিচালিত হয়। স্টোরের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাই ওষুধ গ্রহণ ও সংরক্ষণ করেন এবং স্টোরের চাবিও তার কাছে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘স্টোরে গ্রহণ করা ওষুধের পরিমাণ এবং ফার্মেসিতে সরবরাহের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মেডিকেল সেন্টারের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (স্টোর) মো. নূর এ কামাল দাবি করেন, হিসাবের গরমিল পাওয়া গেলেও তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন।
তার ভাষ্য, ‘কীভাবে এই ঘাটতি হয়েছে, তদন্ত এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও মেডিকেল সেন্টারের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মেডিকেল সেন্টারে ওষুধ না থাকার অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যাচ্ছিল। এ কারণেই অধ্যাপক সালেকুল ইসলাম, জাকসুর প্রতিনিধি হুসনে মোবারক এবং প্রশাসনের ২ কর্মকর্তাকে আকস্মিক পরিদর্শনের জন্য পাঠানো হয়।’
তিনি বলেন, ‘পর্যবেক্ষণে যেভাবে ওষুধের গরমিল পাওয়া গেছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। একইসঙ্গে ওষুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিতরণ ও ব্যবহারসহ পুরো ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযানকালে ওষুধ ক্রয় কমিটির সদস্য ড. সালেকুল ইসলাম, ডেপুটি রেজিস্ট্রার ফখরুল ইসলাম, জাকসুর শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক আবু উবাইদা উসামা, কার্যকরী সদস্য আবু তালহা এবং সমাজসেবা সম্পাদক আহসান লাবিব উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/মহু